জিষ্ণু বসু:

রাজা আর রাজপুত্রের মানসিকতায় বিস্তর ফারাক। কিন্তু যে রাজপুত্র রাজা হবে তার জন্য তো কেবল সময়ের ব্যবধান। না, ঠিক তা নয়! আসল ব্যবধানটা অন্য জায়গায়। রাজা হল অথরিটি উইথ রেসপনসিবিলিটি। মানে হম্বিতম্বি আছে, কিন্তু সাথে সাথে রাজ্য চালানোর গুরুভারটাও আছে। রাজপুত্রের কেবল ক্ষমতা উপভোগ আর হম্বিতম্বি, দায়িত্বের বালাই নেই।
সম্প্রতি ভারতের বড় বড় শহরে অনেক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী গর্ব করে নিজেদের ‘আরবান মাওবাদি” বলেছেন। কংগ্রেস বা বিজেপির মতো পুজিবাদের দালাল দলগুলো তো বটেই, সিপিএম সিপিআই দলের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলিরও যে এই অবস্থা হবে, তা নাকি তারা জানতেন। এই ঋতব্রত আর অনুব্রতর শ্রেণি চরিত্র যে এক সে বিষয়ে তাঁরা ঘন্টা খানেক ভাষণ দিতে পারবেন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ: এতবড় মহাপাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একজন কম্যুনিস্ট হয়ে করেন কি করে? আসলে বুদ্ধবাবু তো রাজ্যের রাজনৈতিক প্রধান ছিলেন তাই ৩৪ বছরের বাম শাসনে যখন রাজ্য থেকে শিল্প প্রায় অদৃশ্য হওয়ার অবস্থায় এসেছিল, ক্রমবর্ধমান বেকারের সংখ্যা তাকে চিন্তিত করেছিল। তাই তিনি তাঁর মতো করে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রাজার ক্ষমতা থাকলেও কর্তব্যের দায় থাকে। গণতন্ত্রে সে দায় পালনে ব্যর্থ হলে সরে যেতে হয়। নতুন নেতৃত্ব, নতুন দল আসে। ‘আরবান নকশাল’ বা মাওবাদিদের একটা রাজ্য কেন একটা গ্রামকে খাওয়ানোরও দায়িত্ব নেই। যে সব গ্রামের বা ব্লকের দখল মাওবাদিরা নিয়েছিল, সেখানে আপামর সাধারণ মানুষের উপর তারা অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল। (পশ্চিম মেদিনীপুর বা পুরুলিয়ায় গিয়ে যে কেউ আজ সচক্ষে দেখে আসতে পারেন।) সেই দায়িত্ব কি আরবান মাওবাদিরা নেবেন?
কিন্তু নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুরের মতো আন্দোলন কিভাবে সামলেছেন কম্যুনিস্ট একনায়করা? মানে পলপট, স্ট্যালিন বা চেয়ারম্যান মাওয়ের চিন? পলপট ১৯৭৫ সালের ১৭ আগস্ট কম্বোডিয়ার কম্যুনিস্ট শাসনের পত্তন করেন। তাঁর খামের রুশে মূলত: কৃষক পরিবারের যুবকরাই ছিল। তাদের ২৩ বছরের শাসনে কম করে ২ লক্ষ মানুষকে এরা হত্যা করেছিল। যে সব ছোট শিশুর বাবা মাকে প্রতিবিপ্লবী তকমা লাগিয়ে হত্যা করা হত, সেই সব শিশুদের আছড়ে মারার জন্য গাছ ছিল। সেই গাছগুলিকে ‘চানকিরি ট্রি’ বলা হত। শর্ত ছিল খামের রুশের সদস্যদের হাসি মুখে বাচ্চাগুলোকে আছড়ে মারতে হবে। স্ট্যালিনের নর সংহার নিয়ে মোটা মোটা ঐতিহাসিক বই প্রকাশিত হয়েছে। এমনই এক নর হত্যার উদাহরণ এখানে আলোচনা করলে প্রাসঙ্গিক হবে। ১৯৩২-৩৩ সালে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যালিন ইউক্রেনের নেতাদের শিক্ষা দিতে ‘মানুষের সৃষ্ট’ দুর্ভিক্ষ তৈরি করেন। স্ট্যালিনের এই ভয়ানক কীর্তিকে ইউক্রেনবাসী ‘হলোডোমোর’ (ক্ষুধার মৃত্যু) বলে মনে রেখেছে। স্ট্যালিন সেবার হলোডোমোরের মাধ্যমে অন্তত ৭০ লক্ষ মানুষকে মেরেছিলেন। চিনের হাইনানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এসইজেড স্থাপিত হয়েছে। যেখানে লক্ষ লক্ষ ‘ইচ্ছুক কৃষক’কে কি করা হয়েছে? কিংবা ১৯৮৯ সালে তিয়ান আন মেন স্কোয়ারে যে ১০,৪৫৪ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। চেয়ারম্যান মাওয়ের চিন কোন মানবাধিকার মঞ্চে তার উত্তর দিয়েছিল? মানবাধিকার? প্রশ্নই নেই! না আদালত, না কোনও বিরোধী দল, না সংবাদ মাধ্যম- কোনও কিছুই থাকে না ওই রকম একদলীয় কম্যুনিস্ট শাসনে। এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়ভার নেবেন কোনও আরবান নকশাল বা আরবান মাওবাদি?
প্রশ্নই ওঠে না। কোনও দায় নেই তাদের। তাদের ভাষায় বললে এইসব ‘আরবান মাওবাদি’দের, বেশিরভাগের শ্রেণিচরিত্র হল পেটি বুর্জোয়া। ব্যক্তি জীবনে পুজিবাদ, ভোগবাদের নির্বাহ বিলাসী , বাজার অর্থনীতির সেবক। অতিবামপন্থা হল তাদের স্টাইল স্টেটমেন্ট। আজকাল ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দটি এরাজ্যে বহুল প্রচলিত। কিষেনজি বা কোটেশ্বর রাওয়ের অনুপ্রেরণা ছিলেন কবি ভারভারা রাও। যারা আজ কবি ভারভারা রাওয়ের জন্য বলছেন তাদের অবশ্যই কিষেনজির নেতৃত্বে সংঘটিত সব সন্ত্রাসের দায়ভার নেওয়া উচিত। ২০১১ সালে কিষেনজি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন সরকারের আমলেই এরাজ্যে নিহত হলেন। সেই সময় কিষেনজির বিরুদ্ধে গনহত্যার, সন্ত্রাসের ৪২টি মামলা চলছিল( http://archive.indianexpress.com/news/42-criminal-cases-against-kishenji-govt/887733/)। সেই হত্যা বা সন্ত্রাসের নৈতিক দায়িত্ব তো অনুপ্রেরণা দাতা ভারভারা রাওয়ের নেওয়া উচিত। নেবেন কোনও ‘আরবান মাওবাদি’?
২০১০ সালের ৬ এপ্রিল ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়ারাতে নিতান্ত অনৈতিকভাবে আক্রমণ করে খুন করা হল ৭৬জন সিআরপিএফ জওয়ানকে। ৯ এপ্রিলে দিল্লির জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবান নকশাল/ মাওবাদিদের অনুপ্রেরনাতে ডিএসইউ এবং এআইএসএ নামে দুটি অতি বিপ্লবী ছাত্র সংগঠন বিজয় উৎসব করে ( https://www.news18.com/news/politics/jnu-naxal-jnu-sots-336466.html)।কলকাতায় যারা নিজেদের ‘আরবান মাওবাদি’ বলছেন তারা এই দুটি ঘটনার দায় নেবেন?
ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির ডায়রেক্টর সিএন ভট্টাচার্য একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে মাওবাদিরা কাশ্মীরের জেহাদিদের মাধ্যমে আফগানিস্তানের তালিবানিদের থেকে অত্যাধুনিক বিস্ফোরক প্রযুক্তি ভারতে এনেছে। (যাhttps://www.google.com/amp/s/m.timesofindia.com/city/kolkata/Maoist-links-with-jihadis-exposed/amp_articleshow/7062597.cms). যা বিগত ছয় দশকে এদেশে আসেনি সেই ভয়ানক প্রযুক্তি আনল মাওবাদিরা। এরপর জেহাদি আর মাওবাদিরা মিলে তা সাড়া দেশে ছড়িয়ে দেয়। এর দায় নেবেন কলকাতার স্বঘোষিত ‘আরবান মাওবাদি’?
আরবান মাওবাদিদের এই রাজপুত্র সুলভ ভাব কলেজ জীবন থেকেই শুরু হয়। কলকাতা বা দিল্লির যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে, ইনশা আল্লা, ইনশা আল্লা’ কিংবা ‘ভারত কি বরবাদি তক, জঙ্গ রহেগি, জঙ্গ রহেগি’ স্লোগান ওঠে, সেখানে অতিবিপ্লবী ছাত্রসংগঠনের মূল অংশই ধনী পরিবারের থেকে আসেন। যেহেতু অতি বাম ছাত্র সংগঠনগুলি সবচেয়ে বেশি উচ্ছৃঙ্খলতায় মদত দেয়, তাই এই ধনী ঘরের ছেলে মেয়েদেরও সবচেয়ে পছন্দের হয় এই সংগঠনগুলি। এই বড়লোকের সন্তানদের ‘মুগয়া ব্রিগেড’ই বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই সব তথাকথিত রাষ্ট্র বিরোধী প্রদর্শনের মূল শক্তি। এরা রাত্রে বিদেশি স্কচ হুইস্কি সেবন করে সকালে ‘দুধ পিয়া তো হামলা বোল’ ধ্বনি দেন। এরা কলেজ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরে কখনও ফিরেও দেখেন না যে দেশের গরিব মানুষগুলো কেমন আছে, কিংবা আদিবাসীরা মরল কি বাঁচল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রানা বসু এই ‘মুগয়া ব্রিগেডে’র উজ্জ্বলতম রত্ন। রানার বাবা কলকাতার নাম করা ডাক্তার ছিলেন, লক্ষপতির একমত্র সন্তান। রানা অতিবামপন্থী ছাত্র নেতা। ১৯৭০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরবান নকশাল’রা ঘোষণা করলেন পরীক্ষা হবে না। রাষ্ট্রই থাকবে না, আর বিশ্ববিদ্যালয়, আর তার পরীক্ষা। তাদের অনুপ্রেরণাতে রানা ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে খুন করেন উপাচার্য গোপাল চন্দ্র সেনকে। তারপর? তারপর রানা বাম-ডান সব নেতার সাহায্যে দেশ ছেড়ে কানাডায় চলে যায়। সেখানে বহাল তবিয়তে বসবাস শুরু করে। আর সেই শ্রেনীশত্রু গোপাল চন্দ্র সেনের স্ত্রী নিতান্ত কষ্টে জীবন নির্বাহ করেন। দারিদ্রের মধ্যেই বড় হয় স্যারের সন্তানেরা। যাদবপুরের মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের রূপকার, ছাত্রদরদী অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র সেনের হত্যার দায়িত্ব নেবেন কোনও রাজপুত্র? আরবান মাওবাদী?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news