পার্থসারথি পাণ্ডা : 
গল্পটা ভবিষ্যপুরাণের। সেখানে ঋষি শতানীকের কাছে যুধিষ্ঠির শুনতে চেয়েছিলেন অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্যের কথা। সেই মাহাত্ম্যের কথা বলতে গিয়ে ঋষির মুখ দিয়ে পুরাণকার ব্যাসদেব অক্ষয় তৃতীয়ার ব্রতকথার ফলাফলও বলিয়ে নিয়েছেন।
পুরাণের যুগে এক গাঁয়ে বাস করত এক বামুন। লোকটার মনে দয়ামায়া ধর্মবুদ্ধি তো ছিলই না, তার ওপরে সে ছিল বেজায় কৃপণ। একদিন এক পথিক খিদেয়-তেষ্টায় খুব কাতর হয়ে এসে দাঁড়াল সেই বামুনের উঠোনে। বামুনকে দাওয়ায় বসে থাকতে দেখে সেই পথিক বলল, ‘ঠাকুরমশাই, অনেকদূর থেকে আসছি, খিদে-তেষ্টায় প্রান আর বাঁচে না। দয়া করে একটু জল আর একটু খাবার যদি দেন, তাহলে এই গরীবের প্রানরক্ষা হয়।
পথিকের কাতর প্রার্থনা শুনে বামুনের মনে দয়া তো এলোই না, উলটে খুব রাগ হল তার। কোথাকার কে, হাত পেতে এসে দাঁড়ালেই হল! দয়ায় মজে সব বিলিয়ে দিয়ে সর্বশান্ত হন আর কি! মুখের ওপর সটান বলে দিলেন, না বাপু, এ বাড়িতে জল নেই, খাবার নেই, বসার আসনও নেই। তুমি বাপু অন্য জায়গায় ব্যবস্থা দেখ, এখানে সুবিধে হবে না।
হতাশ হয়ে করুণ চোখে পথিক এক মুহুর্ত বামুনের দিকে তাকায়। বামুন তার দিকে ফিরেও চায় না। কোন উপায় না দেখে চাদরের খুঁটে মুখের ঘাম মুছে উঠোন ছেড়ে সে পথে নামে। তখন সেই বামুনের স্ত্রী সুশীলা হা হা করে ছুটে আসে। বামুনকে বলে, এ তুমি কি করছ বল তো! পথিক খিদে তেষ্টায় অস্থির হয়ে সামান্য খাবারই তো চেয়েছেন আর তুমি কিনা তাঁকে তাড়িয়ে দিচ্ছ! শুধু নিজেরটুকুই চিনলে, পরকালের কথাটা একবার ভাবলে না!
বামুনকে দু’কথা শুনিয়ে সুশীলা সেই পথিককে ডেকে পা ধোয়ার জল দিল, বসার আসন দিল, বাতাসা দিয়ে জল দিল, দুধ-খইয়ের ফলার খাওয়াল। খেয়ে-দেয়ে খানিক জিরিয়ে পথিক সুশীলাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে বিদায় নিল।

তারপর সেই কিপ্টে বামুন দুম করে একদিন মরে গেল। যমদূতেরা তাকে নিয়ে চলল যমপুরীর পথে। সে পথে পদে পদে কাদা, কাঁটা, কাঁকর। পথ বড় উঁচুনিচু। সেই পথও সহজে শেষ হয় না। পথ চলতে চলতে তার খুব তেষ্টা পেল, একটু জল না পেলে পা যেন আর চলে না। সে আর না পেরে হাতজোড় করে যমদূতদের বলল, বাপু হে, দোহাই তোমাদের একটু জল না খেলে আর যে পারি না!
যমদূতেরা ভেংচি কেটে বলল, ইস, জল না হলে আর পারি না! পথিককে যখন জল না দিয়ে তাড়িয়েছিলি তখন মনে ছিল না বুড়ো! পাপী তুই, কিছুতেই জল পাবিনা।
তারপর বামুন কত অনুনয়-বিনয় করল, কিন্তু যমদূতদের মন গলল না। তারা টেনে হিঁচড়ে ঘষটাতে ঘষটাতে বামুনকে নিয়ে গিয়ে হাজির করল যমের কাছে।
যম সব শুনে বললেন, আরে তরা করেছিস কি, ওনাকে জল দে, জল দে!
যমদূতেরা বলল, কেন প্রভু, ও যে ভয়ানক পাপ করেছে! ও জল পাবে কি, ওর যে আজন্ম নরকবাস হবে প্রভু!
যম তখন নিজের হাতে বামুনকে জল দিয়ে বললেন, ও নাহয় পথিককে দূরছাই করেছে, কিন্তু ওর স্ত্রী তো পথিকের সৎকার করেছে। সেদিনটা ছিল বৈশাখের শুক্লা তৃতীয়া তিথি। একে বলা হয় অক্ষয় তৃতীয়া। এদিন সতীর পুণ্যেই পতির পুণ্য হয়। তাই বামুন পাপ করলেও স্ত্রীর অক্ষয় পুণ্যে তার পাপ কেটে গেছে। অক্ষয় তৃতীয়ায় যে পুণ্য অর্জিত হয়, তার ফল পরিবারের সকলেই পায়, এই পুণ্যের ক্ষয় নেই।
বামুন তখন নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে যমকে বলল, প্রভু দয়া করে বলুন কি উপায়ে এই পুণ্যফল লাভ করা যায়?
তখন যম বললেন, অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে স্নান, দান, জপ, হোম আর বিষ্ণুপূজা করলেই অক্ষয় ফললাভ করা যায়। যে এই ব্রত করে অন্তিমে তার বিষ্ণুলোকে স্থান হয়।
সুশীলার অক্ষয়পুণ্যে বামুন আবার পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল। সেই জন্মে সে হয়েছিল একজন মহাগুণী ও দানশীল পণ্ডিত। আর সে স্ত্রীরূপে পেয়েছিল সেই পুণ্যবতী সুশীলাকেই। এই জন্মে দানাদি ধর্মে তারা দুজনেই হয়েছিল ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news