পারথসারথি পাণ্ডা : 
অনেককাল আগে একটি পত্রিকায় ছোট্ট একটি স্মৃতি মেদুর লেখা পড়েছিলাম। পত্রিকার নাম মনে নেই। তবে সেটি যে লিখেছিলেন অভিনেতা প্রীতি মজুমদার, এটা বেশ মনে আছে। তাঁকে আপনারা অসামান্য অভিনয় করতে দেখেছেন মধু বসুর ‘আলিবাবা’ ছবিতে বুড়ো মুচি মুস্তাফার চরিত্রে। তারপর যা হয় আর কি; দিন বদলাল, খুচরো খাচরা দু’একটা চরিত্র জুটতে লাগল কপালে। আপনারা তাঁকে দেখেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে এক দারোয়ানের চরিত্রে অভিনয় করতে। সেই যে গুপি যখন তানপুরা বাগিয়ে টং এর ওপর বসে সক্কাল সক্কাল রাজাকে হেঁড়ে গলায় বেসুরো গান শোনাতে বসেছে, তখন যে দারোয়ান তাকে ডাকতে গিয়েছিল, সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রীতি মজুমদার।
একবার প্রীতিবাবুর খুব টাকার দরকার, কোথাও কারও কাছেই চেয়ে পাচ্ছেন না। গেলেন উত্তমকুমারের কাছে। তিনি তখন একটা স্টুডিওতে শ্যুটিং করছিলেন। পরিচালকের কাছে একটু সময় চেয়ে সব শুনে একটা চিরকুটে কীসব লিখে খামে ভরে প্রীতিবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, প্রীতিদা, এটা নিয়ে তুমি আমার বাড়িতে যাও। গৌরীকে এটা দিও তাহলেই ও তোমায় টাকা দেবে।
খামখানা হাতে নিয়ে প্রীতিবাবু পথে বেরোলেন। খানিকটা এগিয়ে তাঁর ভারি কৌতুহল হল এটা জানার যে, উত্তম তাঁর সম্পর্কে কী লিখেছেন। একবার ভাবলেন দেখাটা কী উচিত হবে? কিন্তু কৌতুহল বাধা মানল না, খাম থেকে চিরকূটটা বার করলেন। দেখলেন তাতে লেখা—‘ গৌরী, প্রীতিদা অনেক বড় একজন শিল্পী। ওঁকে সম্মান করো, আপ্যায়ন করো। ওঁকে হাজার টাকা দিও।’ চিঠিটা প্রায় এরকমই ছিল, স্মৃতি থেকে লিখলাম। তো, চিঠিটা পড়ে প্রীতিবাবুর চোখে জল এসে গেল। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা মানুষটা আজ তাঁর মতো প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া একটা অভিনেতার প্রতি যে শ্রদ্ধা আর সম্মান দিয়েছেন, সেটা তাঁর কাছে হাজার পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি। এমন করে আজকাল তাঁকে আর কেউ বলে না, এভাবে তো কেউ সম্মান দেয় না। মনুষ্যত্বের মাপকাঠিতে এমনই দরাজ মনের মানুষ ছিলেন উত্তমকুমার।
শেষ দিকে ঋত্বিক ঘটক যখন চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন সুপ্রিয়ার অনুরোধে তাঁর ছবি প্রোডিউস করতেও রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ অব্দি তা আর হয়ে ওঠেনি। উত্তমের শৃংখল জীবন আর ঘটকের শৃংখলহীনতার ফাঁকে কাজটা আর হয়নি। জানেন টাকা হাতে পেলেই তিনি মদ খাবেন তবু অর্থ সাহায্য চাইতে এসে খালি হাতে কখনই ঘটককে ফিরিয়ে দেননি উত্তম।
চলচ্চিত্র শিল্পীদের সাহায্যের জন্য ‘শিল্পী সংসদ’ গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে উত্তমকুমার মাথা গোঁজার জন্য অনেক কলাকুশলীকেই জমি কিনে দিয়েছেন, অর্থ সাহায্য তো আছেই। তিনি যত বড় নক্ষত্র ছিলেন, তার থেকেও বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তাই তো ইতিহাস ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সবার হৃদয়ের আপনার লোক, সর্বকালের মহানায়ক।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news