Breaking News
Home / TRENDING / সুভাষ মুখোপাধ্যায়: পদাতিকের লং-মার্চ জন্মশতবর্ষ থেকে সহস্রাব্দের দিকে

সুভাষ মুখোপাধ্যায়: পদাতিকের লং-মার্চ জন্মশতবর্ষ থেকে সহস্রাব্দের দিকে

পার্থসারথি পাণ্ডা

সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবি হিসেবে কবিতার কাছে যতটা দায়বদ্ধ, তার চেয়েও অনেক বেশি দায়বদ্ধ মানুষের কাছে। নিতান্তই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবার আকুলতা তাঁর ছিল বলেই, তিনি তাঁর সদ্য লেখা কবিতা শোনাতে ছুটে যাননি কখনোই কোন প্রতিষ্ঠিত বা বর্ষিয়ান কবি-সাহিত্যিকের দরবারে, তাঁর কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন তাই বাড়ির বর্ষীয়ান কাজের লোক। সেই সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষটির মতামতই তাঁর কাছে সবসময় গুরুত্ব পেত, তিনি মনে করতেন কবিতাটি যদি এই মানুষটিকে ছুঁতে পারে, তাহলেই তাঁর কবিতা সার্থক। কবিতা আসলে তাঁর কাছে সেই পদাতিক পথিককুলের মধ্যেকার লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা– যাঁরা নিরন্তর এগিয়ে চলেন নতুন পৃথিবীর মানবজমিনে বিপ্লবের বীজ বুনতে বুনতে।

‘সুকান্ত সমগ্র’ সম্পাদনা করতে গিয়ে সম্পাদকের ভূমিকায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, মিছিলের পথে হাঁটতে হাঁটতে সহযোদ্ধা ও অনুজপ্রতিম বন্ধু সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় বার বার উঠে আসত মানুষের কথা, কবিতার কথা। কবিতার ক্ষেত্রে তাঁরা কখনোই ভাবতে বসেননি ‘কি নিয়ে লিখব’, ভাবনা ছিল ‘কেমন করে লিখব’। মোদ্দা কথা হল, সাধারণ বঞ্চিত খেটে খাওয়া মানুষ দাবি নিয়ে তাঁদের কবিতায় উঠে আসবেন এ যেমন নিশ্চিত ছিল, তেমনি কবিতার আঙ্গিককে সহজ করতে হবে, ভাষাকে সাধারণের মুখের ভাষার কাছাকাছি এনে ফেলতে হবে, এটাই ছিল তাঁদের সাধনা। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর নিজের মতো করে সেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, লিখেছিলেন ‘প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা, ভেঙেছিস ঘরবাড়ি’ পংক্তিমালা; সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, নির্দ্বিধায় লিখেছিলেন—
‘আমাকে কেউ কবি বলুক
আমি চাই না
…………
আমি যেন আমার কলমটা
ট্রাক্টরের পাশে নামিয়ে রেখে বলতে পারি—
এই আমার ছুটি
ভাই, আমাকে একটু আগুন দাও।’
তাঁর এই উচ্চারণে ও অভীপ্সায় ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’ বা ‘আমি কবি যত কামারের যত কাঁসারের যত কুমারের’–ধরণের নিছক রোমান্টিক ভাবাবেশ নয়, ছিল এক বলিষ্ঠ প্রত্যয়, আন্তরিক অঙ্গীকার।

বিপ্লব, প্রতিবাদ, নতুন দিনের স্বপ্ন, রাজনৈতিক ইস্তাহারের বাইরেও সুকান্ত প্রেমের কবিতা লিখেছেন; কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে–
‘প্রেমে জাগে বিচ্ছেদের ভয়,
পদে পদে ভুলভ্রান্তি
অথচ জীবন তার চেয়ে বড়ো
ঢের ঢের বড়ো…’।
যে সমাজে কখনও সত্যিকারের মুক্তি আসে না, যেখানে কবি নিজেকে সংগ্রামী সৈনিকের পোশাকে সজ্জিত করেছেন, যাঁর হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উদ্যত সঙ্গিন, যাঁর মুখে শ্রেনিহীন সমাজের শ্লোগান, তাঁর কাছে ব্যক্তিগত প্রেম, নিছক যৌনপ্রেম গৌণ। তাই কবিতায় প্রেমিকা-প্রতিমা নির্মাণ করে, তাকে–
‘তুমি আকাশ,
তুমি আমার জীবন’
বলে, তার রাজকন্যার প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেও বলে বসেন–‘সেই রাক্ষুসীই আমাকে খেলো’। আসলে, কবিতায় ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দিতে তিনি একেবারেই চাননি, ব্যক্তিক প্রেমকেও না। তার চেয়ে বরং তিনি স্বস্তি পান ব্যষ্টির কাছে গিয়ে, তাঁদের একজন হয়ে–
‘যাই
গিয়ে দেখে আসি
কী বীজ বুনছে চাষি।’
সুভাষ মুখোপাধ্যায় রোমান্টিক স্বপ্নরাজ্যের ভিত্তিভূমিতে পদাঘাত করে, সুকান্তের ‘ঝলসানো রুটির’ গান গাইতে গাইতে কখন যেন সাধারণ মানুষের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সাধারণের একজন হয়ে উঠেছিলেন, যাঁর কবিতা সাধারণের ঠোঁটে উঠে এসেছিল ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’র মতো প্রবাদপংক্তি হয়ে। এরই জন্য সংগ্রামে ও সাহচর্যে তিনি এই জন্মশতবর্ষে যেমন প্রাসঙ্গিক, ঠিক তেমনই প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন আগামী সহস্রবর্ষেও। কারণ, তাঁর কবিতা নিছক অনুপ্রাসের ঝংকার নয়, সময় ও মেহনতি মানুষের সংগ্রামের দলিল। সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *