নীল রায়
“জোটের আঙুর ফল টক।” অন্তত তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে তো বটেই। ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেড সমাবেশকে কেন্দ্র কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ শুরু হয়েছিল। সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলতি দিল্লি সফরে সেই সেতুবন্ধন তো বটেই, কংগ্রেস-তৃণমূলের মধ্যে জোট সম্ভাবনা ফের জোরালো ভাবে দেখা দিয়েছিল। বুধবার গোর্খা ওয়েলফেয়ার সেন্টারের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী যান সত্যগ্রহ মঞ্চে। মাঝে সংসদেও গিয়েছিলেন তিনি। কংগ্রেস তৃণমূল জোট ভাঙার কারণ প্রসঙ্গে, রসায়ন হিসেবে কাজ করেছে সংসদে অধীর চৌধুরীর চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা। সংসদ অধিবেশনে বহরমপুরের কংগ্রেস সাংসদ বক্তৃতায় তীব্র আক্রমণ করেন তৃণমূল নেতৃত্বকে। অধীর বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২৫ লক্ষ মানুষের টাকা লুট করেছে। চিটফান্ডের টাকা লুট করে এরা সর্বস্বান্ত করেছে রাজ্যের গরিব মানুষকে এদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া হোক,। এই এখানে যাঁরা চোর চোর বলছে, তাঁরাই চোর। চোর মাচায়ে শোর! বাংলায় গরিব মানুষের টাকা লুঠ করেছে। সেই কারণেই এই বিলে আমি সমর্থন জানাচ্ছি।” অধীরের এমন ঝাঁঝালো বক্তৃতায় সমর্থন করে টেবিল চাপড়ান কংগ্রেসের অন্য সাংসদরা। টিভিতে দেখা যায় অধীর চৌধুরীর এমন আক্রমণাত্মক বক্তৃতা শুনে মুচকি হাসছেন রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। যা লোকসভায় বসেই প্রত্যক্ষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের প্রতিনিধিরা। বিষয়টি জানতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অধীর চৌধুরীর এহেন আক্রমণে কংগ্রেসের সাংসদদের সমর্থনে টেবিল চাপড়ানোর ভালোভাবে নেননি তৃণমূল সুপ্রিমো। ঘটনায় বেজায় ক্ষুব্ধ হন তিনি। সংসদ অধিবেশন ছেড়ে বেরোনোর পর তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সূত্রের খবর, তখনই সুদীপকে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টা আসনে তৃণমূল এককভাবে লড়াই করবে বলে ঘোষণা করে দিতে বলেন মমতা। নেত্রীর নির্দেশ মতো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে উওর কলকাতার সংসদ ঘোষণা করেন, “বাংলায় বিজেপির আক্রমণ রুখতে তৃণমূল একাই যথেষ্ট। বাংলায় কোন জোট হবে না।৪২ টি আসনেই লড়বেন জোড়া ফুলের জনপ্রতিনিধিরা।” প্রসঙ্গত, লোকসভা ভোটে জোট নিয়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আহমেদ প্যাটেল ও তৃণমূলের পক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজকুমারের বাড়িতে সিবিআই হানা দেওয়ায় মমতা ধরনা অবস্থানে বসে যান। ধরনা অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে মমতাকে ফোন করে সমর্থন জানান স্বয়ং রাহুল গান্ধী। তারপরে আহমেদ প্যাটেল ও মমতার মধ্যে জোট নিয়ে কথাবার্তা আরো জোরালো ভাবে হতে থাকে বলেই সূত্র মারফত জানা গিয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে চারটি আসন কংগ্রেসকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বহরমপুর, জঙ্গিপুর, মালদা দক্ষিণ সহ আরো একটি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বকে। বাকী ৩৮ টি আসনে একক ভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত এআইসিসিকে জানিয়ে দেয় তৃণমূল। সূত্রের খবর দিল্লী পৌঁছে এই অবস্থানেই বহাল ছিলেন তৃণমূল নেত্রী। ২০০৯ সালের লোকসভা ও ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে বামফ্রন্টকে হারিয়েছিল দু’দল। ২০০১ সালে সিপিএমের বিরুদ্ধে জোট বেধে ছিল কংগ্রেস-তৃণমূল। সে যাত্রায় জোট ফলপ্রসূ হয়নি। এদিন অধীর চৌধুরীর ঝাঁজালো বক্তৃতায় অধিবেশনে তৃণমূল সাংসদরা যেভাবে অপমানিত হয়েছেন, তাতেই আর জোট সম্ভব না বলেই মনে করছে তৃণমূল সংসদীয় দলের একটি বড় অংশ। চিটফান্ড নিয়ে কংগ্রেসের সংসদে আক্রমণকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেননি সাংসদরা। তাই আগামী লোকসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস ৪২টি আসনে একক ভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত রাজধানীতে বসেই নিয়ে ফেললেন মমতা। কংগ্রেস শিবির সূত্রে খবর, মমতার দল ধারাবাহিকভাবে ভাঙ্গন দাঁড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসে। যা নিয়ে একাধিকবার বাংলার কংগ্রেস নেতারা এআইসিসিতে অভিযোগ জানিয়েছেন। আরো জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো রকম জোটে যেতে তারা নারাজ। এমন ঘটনার মাঝে মালদা উত্তরের কংগ্রেস সাংসদ মৌসম বেনজির নূর যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস। তাই মনে করা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবেই অধীর চৌধুরীকে এহানে বক্তিতা দিতে ইন্ধন যুগিয়েছে এআইসিসি নেতৃত্বই। সেদিকে তাকিয়েই আপাতত এবারের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের ফল তৃণমূলের কাছে টকই থেকে যাচ্ছে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news