রণবীর ভট্টাচার্য
এটা নব্বইয়ের দশক নয়, পি ভি নরসীমা P (V Narsimha Rao) রাও মারা গেছেন কয়েক দশক হল, টিভি নয় তবে স্মার্ট ফোন মানুষের কাছের বন্ধু – এর মাঝখানে করোনা পর্ব এসে স্রেফ পাশা বদলে দিল। লকডাউনে সময় কাটবে কি করে, শুরুতে অনেকেই এরকম ভাবছিলেন। তবে তিন দফা লকডাউনের এই পর্বে এসে দূরদর্শন যে সত্যি দূরদর্শী, তা আবার প্রমাণ হয়ে গেল! গতকাল ডিডি ইন্ডিয়ার টুইটার হ্যান্ডেলে জানানো হল যে গত ১৫ই এপ্রিল পৃথিবীব্যাপী ৭৭ লক্ষ মানুষ দূরদর্শনে রামায়ণ (Ramayana) দেখেছেন নিজের বাড়িতে বসে। কেউ দেখেছেন টিভিতে আর কেউ কেউ ডিজনি হটস্টারের মত অ্যাপের মাধ্যমে।
সিনেমা, সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ – এই লকডাউনে বিনোদন তৈরিতে ছেদ পড়েছে সর্বত্র। তর্কের খাতিরে যদি বাড়িতে বানানো কিছু শর্ট ফিল্মের কথা বলতেই হয়, তাহলে মেনে নেওয়া ভালো যে বেশিরভাগের গুণগত মান মাঝারির চেয়েও শোচনীয়। অনেকে হয়তো নেটফ্লিকস, অ্যামাজন প্রাইম, জি ফাইভ এর কথা বলবেন, কিন্তু মাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে ওয়েব সিরিজ দেখা মানুষের সংখ্যা এখনও খুব বেশি নয়। তাছাড়া কম বেশি সাধারণ ফোন সবার থাকলেও, স্মার্ট ফোন সবার নেই। একই কথা ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রেও সত্যি। এই অবস্থায় টিভি চ্যানেল, রেডিও, ইন্টারনেট পোর্টাল – সর্বত্র পুরনো অনুষ্ঠান চালানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী টিভি চ্যানেলের সংখ্যা কম নয়, তাই বাড়িতে বসে এই সময়ে মানুষ অনেকটা সময় জুড়ে টিভি দেখবেন, এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু দূরদর্শনের এই দুর্ধর্ষ টিআরপি আর তার সাথে রামায়ণ – মহাভারতের এই সাফল্য, অবাক করে দেওয়ার মত।
কিছু মানুষ যারা মেঘলা আকাশে তারা খোঁজেন, অনেকে এর মধ্যে গেরুয়া এজেন্ডা বা মোদী ম্যাজিক খোঁজার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তব হল যে কেবল টিভির বিপ্লবের আগে, দূরদর্শন ছিল মানুষের সবচেয়ে কাছের, বিনোদনের সেরা পসরা। তাই শাহরুখ খান থেকে নাসিরুউদ্দিন শাহ, শ্যাম বেনেগাল থেকে গুলজার, কিংবা সদ্য প্রয়াত ইরফান খান – দূরদর্শনের পর্দায় রোমাঞ্চিত করেছেন আপামর ভারতবাসীকে। যদি বিনোদনের কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু দেখা যায়, তাহলে অবশ্যই দেখা যাবে দূরদর্শন কিভাবে ভারতীয় বিনোদনকে সমৃদ্ধ করেছে। এক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য, এই লকডাউনের মধ্যে দূরদর্শন দিন-রাত রামায়ণ – মহাভারত দেখাচ্ছে এমনটাও নয়, বরং ভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে দিনভর সূচি অনুসারে আর আপামর ভারতবাসী তা উপভোগ করছেন।
রামায়ণ, মহাভারত যখন প্রথমবার দেখানো হয় দূরদর্শনের পর্দায়, তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সারা ভারতে। এমনকি বলা হতো, এই সিরিয়ালগুলো চলার সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন চ্যানেল নিজেদের মত করে রামায়ণ, মহাভারতের সম্প্রচার করেছে, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার ধারে কাছে পৌঁছতে পারেনি। তবে মহাকাব্য নিয়ে ভারতীয়দের ভালোলাগা অস্বীকার করা যাবে না। যতই ধর্মের আবরণ পরানোর চেষ্টা হোক না কেন, মহাকাব্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমেনি। সাধারণ বাংলা চ্যানেলগুলো শেষ কয়েক বছরে খনা, লোকনাথ, রানি রাসমণী, বামাক্ষ্যাপার মত বিষয় নিয়ে অনেক কাজ করেছে। শুধুমাত্র বাংলা চ্যানেল নয়, অন্য ভাষার চ্যানেলের ক্ষেত্রেও এই ট্রেন্ড দেখা গিয়েছে। কিন্তু মহাকাব্যের আকর্ষণ একদম আলাদা, মানুষকে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলিয়ে বিনোদনের সেরা স্বাদ উপহার দেয়।
কিন্তু এখন দূরদর্শনের অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয় না কেন? বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, বিষয়বস্তু ভালো হলে, যেখানেই দেখানো হোক না কেন, মানুষ তা দেখার চেষ্টা করবেন। তাই মেনে নেওয়া ভালো যে বর্তমান দূরদর্শনের মাঝারি মানের অনুষ্ঠান মানুষের মনে দাগ কাটে না। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য সংস্কৃতি বিভাগে যারা কর্মরত রয়েছেন, তাদের যথেষ্ট ভাবার অবকাশ রয়েছে। তবে কুর্নিশ জানাতেই হয় মন্ত্রকের সেই সমস্ত মানুষকে যারা রামায়ণ মহাভারত পুনরায় দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news