নীল রায়
রাত পোহালেই ভোট দার্জিলিংয়ে! সৎপাল মহারাজের “ভোকাল টনিক”ই কী দার্জিলিংয়ের বিজেপির সঞ্জীবনী সুধা? এখন এমন কথাই ঘোরাফেরা করছে পাহাড়ের রাজনীতির প্রতিটি কোনায়। এই কেন্দ্রের লড়াই যে বিজেপি বনাম তৃণমূলের, তা বলতে কোনও রাজনৈতিক বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০০৯ সাল থেকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে হাতে নিয়ে দার্জিলিং আসনটি দখলে রেখেছে বিজেপি। প্রথমবার যশবন্ত সিংহ ও পরবর্তী সময়ে সুরিন্দর সিংহ আলুওয়ালিয়াকে সমর্থন দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছিলেন বিমল গুরুঙ্গ-রোশন গিরিরা। কিন্তু, এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক মাস যাবত আত্মগোপন করে রয়েছেন বিমল গুরুঙ্গ, রোশন গিরি সহ মোর্চার একাধিক নেতা। এই মওকায় অনীত থাপা ও বিনয় তামাঙ্গদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড় দখলে নেমেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যা একেবারেই না পসন্দ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সহ পাহাড়ের বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের। তাই পাহাড়ের রাজনীতিতে সাপে-নেউলে বলে পরিচিত জি জে এম ও জি এন এল এফ একযোগে এবার বিজেপির প্রার্থী রাজু সিংহ বিস্তকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুরিন্দর সিংহ আলুওয়ালিয়াকে সরিয়ে বছর ৩২-এর মণিপুরের ভূমিপুত্রকে যেমন বিজেপি পাহাড় দখলের যুদ্ধ নামিয়েছে তেমনি তৃণমূল কংগ্রেস দার্জিলিঙের সদ্য পদত্যাগী মোর্চা বিধায়ক অমর সিংহ রায়কে জোড়া ফুল প্রতীকে প্রার্থী করেছে। পাহাড়ের মানুষের ভাবাবেগের কথা মাথায় রেখে সিপিএমের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ সুমন পাঠককে ২০১৪ সালের পর আবারও দার্জিলিংয়ের প্রত্যাশী করেছে। কংগ্রেসই একমাত্র দল যারা পাহাড়ের বদলে সমতলের নেতাকে এই দৌড়ে শামিল করেছে। তাদের প্রার্থী মাটিগাড়া নকশালবাড়ির বিধায়ক শঙ্কর মালাকার। ময়দান এই চার প্রার্থী থাকলেও লড়াই মূলত রাজু সিংহ বিস্ত বনাম অমর সিংহ রাইয়ের। জানা যাচ্ছে দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াং বিধানসভা থেকেই বিজেপি প্রার্থী মূলত ব্যবধান নিয়ে জয় নিশ্চিত করতে চাইছেন। আর তৃণমূল পাহাড়ের ভোটব্যাঙ্ক মোটামুটি বাড়িয়ে শিলিগুড়ি, মাটিগাড়া নক্সালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া ও উত্তর দিনাজপুরের বিধানসভা চোপড়া থেকে দার্জিলিং কেন্দ্রে লিড নেওয়ার ভাবনায় রয়েছে। কিন্তু বাংলার শাসক দলের এই কৌশল কতটা কাজ দেবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ২০১৪ সালের ভোটে সুরিন্দর সিংহ আলুওয়ালিয়া পাহাড়ের ৩ বিধানসভা থেকে যেমন বিশাল ব্যবধান পেয়েছিলেন। তেমনই সমতলের তিন বিধানসভাও তারই পক্ষে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়াকে হারিয়ে সংসদে পৌঁছাতে খুব বেশি ঘাম ঝরাতে হয়নি আলুওয়ালিয়াকে। বিমল গুরুঙ্গের অনুপস্থিতিতে গত বছর তিনেক ধরে তৃণমূল পাহাড়ে সংগঠন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু, দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা নেতৃত্বের বিনয় তামাঙ্গপন্থীদের। বিনয় তামাঙ্গের প্রস্তাব ছিল নির্দল কোনও গোর্খা প্রার্থীকে দাঁড় করিয়ে মোর্চা ও তৃণমূল সমর্থন দিক । কিন্তু এমন প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে অমর সিংহ রায়কে দার্জিলিং লোকসভা থেকে তৃণমূল প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলের মত, বিনয় তামাঙ্গ অনিত থাপাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলেই হয়তো লাভবানই হত তৃণমূল। কারণ পাহাড়ের মানুষ বাংলার কোনও রাজনৈতিক দলকে ভোট দিতে চাইবে না। সেদিক থেকে বিজেপিকে গত ১০ বছর ভোট দিয়ে তাদের গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলন জিইয়ে রয়েছে। সঙ্গে এই সময়ে একটিবারের জন্য পাহাড়ের দখল নিতে গেরুয়া শিবিরের নেতারা কোনরকম আস্ফালন দেখাননি। এমতাবস্থায় মনে করা হচ্ছে কালিম্পং, কার্শিয়াং ও দার্জিলিং থেকেই বিজেপি প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এবারের ভোটে প্রকাশ্যে হাজির হতে পারছেন না বিমল গুরুঙ্গ, রোশন গিরি। বিষয়টি নিয়ে রীতিমত চিন্তায় ছিলেন বিজেপি নেতৃত্ব। কিন্তু, শেষমেষ পাহাড়ের গুটি সাজানোর শুরু করে পদ্ম শিবির। গোর্খা জনগোষ্ঠীর কাছে উত্তরাখণ্ডের আধ্যাত্মিক গুরু তথা-রাজনীতিক সৎপাল মহারাজের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। একসময় সৎপাল মহারাজকে দার্জিলিংয়ের প্রার্থী করার কথা ভেবেছিল বিজেপি। কিন্তু, তিনি রাজি না হওয়ায় রাজু সিংহ বিস্তকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়। সঙ্গে বিমল গুরুঙ্গদের অনুপস্থিতিতে সৎপাল মহারাজকে দার্জিলিঙে রাজুর পক্ষে প্রচার করতে নামানো হয়। যা পাহাড়ের রাজনীতিতে বিজেপি প্রার্থী এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করবে বলেই মনে করছে গেরুয়া শিবির।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news