পার্থসারথি পাণ্ডাঃ

শান্তিনিকেতনের শিশু ভবনের শিক্ষকমশাই নেপালবাবুকে খুব পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর আপনভোলা স্বভাবের জন্য। নেপালবাবুর মনটা ছিল একেবারে শিশুর মতো। তাই আশ্রমে তাঁর ওপর দেওয়া হয়েছিল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ানোর ভার। এক একদিন এমন সব কাণ্ড ঘটিয়ে বসতেন যে, তা শুনে লোকে হেসে বাঁচত না! পথে ঘাসের ফুল, ফড়িং এবং এটা ওটা দেখতে গিয়ে হামেশাই তিনি ট্রেন মিস করতেন। কখনও ভুল ট্রেনে উঠে পড়তেন। কখনও বা বাচ্চাদের নিয়ে খেঁজুর রস খেতে গিয়ে ফেরার সময় পথ আর কিছুতেই খুঁজে পেতেন না। আর সেই মুহূর্তে তিনি বেজায় টেনশনে ঘেমেনেয়ে একেবারে একশা হয়ে যেতেন। বেগতিক দেখে বাচ্চারা পথ দেখিয়ে তাঁকে স্কুলে ফিরিয়ে আনত। একবার হল কি, কেয়াফুল দেখতে গিয়ে এমন মোহিত হয়ে গেলেন যে, স্কুলে আসার কথাই ভুলে গেলেন, কয়েক ঘন্টা পরে খেয়াল হতে স্কুলে ফিরে দেখেন যে, ছেলেমেয়েরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করে করে চলে গেছে। এরকম ঘটনা তাঁর জীবনে প্রায়ই ঘটত। তাই নেপালবাবু ভয়ে ভয়ে থাকতেন, কেউ গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে এই নিয়ে নালিশ না করে দেয়! রবীন্দ্রনাথ এদিকে জানেন তো সবই। তবুও একদিন রবীন্দ্রনাথ একখানা কড়া চিঠি ছাড়লেন তাঁকে—কাল সকালে আমার এখানে চা খেয়ে যাবেন এবং দণ্ড নিয়ে যাবেন।
চিঠি পেয়ে নেপালবাবু পড়লেন মহা চিন্তায়—গুরুদেব ‘দণ্ড’ দেবার কথা বলছেন, এবার চাকরিটা নির্ঘাত গেল! কিন্তু কি আর করা, আদেশ মাথায় নিয়ে গুরুদেবের কাছে পরদিন সকালে যেতে হল, দুরুদুরু বুকে চা-ও খেতে হল। এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথ একটাও কথা বলেননি। আড়চোখে এক একবার দেখছিলেন নেপালবাবুকে। আর মুচকি মুচকি হাসছিলেন। নেপালবাবু তখন বুকের শ্বাস চেপে ‘দণ্ডে’র জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘেমেনেয়ে অস্থির! কিছু বলতেও পারছেন না, উঠতেও পারছেন, শুধুই উসখুস করছেন। তখন আর বেচারাকে সাসপেন্সে না-ঝুলিয়ে মুচকি হেসে একখানা লাঠি এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই যে আপনার ‘দণ্ড’! কথাটা শুনেই স্বভাবভীরু নেপালবাবুর বুকের ভেতর ধ্বক করে ওঠে। তাঁর অন্যমনস্কতা কাটে। চেয়ে দেখেন, গুরুদেব তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন তাঁরই প্রিয় লাঠিখানা। রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেন, আপনারই ‘দণ্ড’, ক’দিন আগে মনের ভুলে ফেলে গিয়েছিলেন।
নেপালবাবু ক’দিন ধরেই লাঠিটা পাচ্ছিলেন না, কোথায় ফেলেছিলেন তাও মনে করতে পারছিলেন না, লাঠির শোকে বড্ড মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল তাঁর; এখন প্রিয় লাঠিটি পেয়ে শিশুর মতো সরল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর মুখ আর তারই মধ্যে শিশু ভোলানাথকে দেখতে পেলেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news