সু সেন :
নতুন প্রজন্মকে জমায়েতে আনতে টুম্পা মার্কা প্যারোডি বা ফ্ল্যাশ মবের প্রচার আর ভাইজানের ক্যারিশ্মা। এইরকম নানা পথেই ভরসা রেখে ব্রিগেড সমাবেশের চেহারায় মোটের উপর উতরে গেল সিপিএম। কেন এই রাস্তা বেছে নেওয়া?
তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে এছাড়া আর উপায়ও ছিল না বামেদের। কারণ, সমাবেশে লোক টানতে তেমন কোনও পোস্টারের মুখই তো ছিল না আলিমুদ্দিনের হাতে।
লরিতে বসানো ‘ডিজে বক্স’! তাতে উচ্চস্বরে বাজছে সিপিএমের ‘টুম্পা’ গানের প্যারোডি! বিচিত্র কায়দায় সজ্জিত একটি লরি সামনের মিছিলের চাপে খানিকটা থামতেই সঙ্গে থাকা উৎসাহীরা পাড়ার বিসর্জনের নাচ শুরু করে দিলেন। কয়েক জন শুয়ে পড়লেন রাস্তাতেই। উড়তে শুরু করল লাল আবির। সঙ্গে মুহুর্মুহু সিটি! বামেদের ডাকা ব্রিগেডের মিছিলে একেবারেই আনকোরা নতুন অভিজ্ঞতা। দেখে শুনে বিভ্রম হতে পারে একি বামেদের ব্রিগেডমুখী মিছিল না পুজোর বিসর্জন দিতে যাওয়া কোনও ভিড়? ভোটের ফলাফল ক্রমশই খারাপ হচ্ছে। তাই বদলাতে হল রণকৌশল।
হাতের লাল ঝান্ডা বা অনেকের মাথায় কাস্তে হাতুড়ি ছাপ লাল টুপি না থাকলে দেখে বোঝার উপায় ছিল না। বদলে যাওয়া এমনই নানা চিত্র ধরা পড়ল রবিবাসরীয় ব্রিগেডে । হেই সামালো গণসঙ্গীত বা ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গেয়ে ময়দানের দিকে যেতে দেখা যেত যে মিছিলকে, কালের অমোঘ নিয়মে সেই মিছিলই ‘চরিত্র বদলে’ নাচল টুম্পা গানের প্যারোডির সঙ্গে। রবিবারের ব্রিগেডের সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই ‘টুম্পা সোনা’ গানের প্যারোডির পাশাপাশি বাম ছাত্র-যুবদের দিয়েই কলকাতা তথা শহরতলির একাধিক জায়গায় প্রচার চালানো হয়েছিল। নাচ-গানের মাধ্যমে প্রচারের ওই উদ্যোগকে বলা হচ্ছিল ‘ফ্ল্যাশ মব’। সেই প্রচারের ডিভিডেন্ডও যে এসেছে এদিন ব্রিগেডের ছবিই তা বুঝিয়ে দিয়েছে।
অবশ্য সমাবেশে উপস্থিত বর্ষীয়ান চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদারের কথায়, ‘ নতুন জিনিস আসাই তো স্বাভাবিক। গণসঙ্গীতও গাওয়া হয়েছে সমাবেশে। তা ছাড়া গানটি যেমন বিনোদন দেয়, আবার ভাবায়ও। এতে আমি কোনও সমস্যা দেখি না।’’ কিন্তু যে কঠিন পরিস্থিতির কথা বলে বামেদের এ দিনের ব্রিগেডের ডাক, সেখানে টুম্পা নাচ?
সত্তরের দশকের সিপিএম হলে হয়তো বলত শহীদ মইদুলের স্মরণে ব্রিগেড চলো। কিন্তু নব্য সিপিএমকে তাে জমায়েতের জন্য ভাইজানের ভরসায় থাকতে হয়। সে এক সময় ছিল যখন ব্রিগেডের মিছিলে স্লোগান উঠত, জ্যোতি বসুর জনসভায় দলে দলে যোগ দিন। পরে সময়ের নিয়মে তা বদলে হল, বক্তা কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, ব্রিগেড সমাবেশে যোগ দিন। আর এখন…. সর্বশেষ লোকসভা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট বামেদের ভোট গিয়েছে পদ্ম শিবিরে।
বিজেপির ডাকা ব্রিগেডের মূল আকর্ষণ যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা দলের কর্মী-সমর্থকেরা সকলেই জানেন। ঠিক যেমন তৃণমূলের সমাবেশের প্রধান বক্তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু না গড়ে ওঠা জোটের ব্রিগেড জমায়েতের তো কোনও ক্রাউডপুলার নেই। অসুস্থ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, তাই নানা জল্পনা থাকলেও রবিবার ব্রিগেডের মঞ্চে সেই বুদ্ধদেবের কথা অনুচ্চারিতই থেকে গেল। বাম নেতাদের বক্তব্যেও উঠে এল না প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রসঙ্গ। বরং জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য এক সময় ব্রিগেডের সভায় বলতে উঠলে কলরোল তৈরি হত রবিবারের ব্রিগেডে প্রায় সেই আওয়াজই উঠল মঞ্চে আব্বাস সিদ্দিকির আবির্ভাবে। সমর্থনে ক্ষয় হলেও কৌশলী অবস্থানে আই এস এফের সব দাবি মেনে নিয়ে সূর্যকান্ত মিশ্ররা ব্রিগেডের জমায়েত নিশ্চিন্ত করার কাজটি অনেকটাই সেরে ফেলেছিলেন। সে ছবি তো স্পষ্টই হল যখন আব্বাস সিদ্দিকি বললেন, এক সপ্তাহ আগেই জোট হলে আরও বড় জমায়েত হত। এর সঙ্গেই বাড়তি সম্বল ছিল তরুণ প্রজন্মের আবেগ।
বাস্তবিকই জেনারেশন নেক্সটের ভরসায় এ বারের ব্রিগেডের জমায়েত সামাল দিল বামেরা। রাস্তায় মিছিলের মুখ হয়ে ওঠা তো বটেই পাশাপাশি স্লোগানেও সামনের সারিতে জায়গা করে নিল বামেদের তরুণ-ব্রিগেড। উঠল ‘টেট দুর্নীতি’ থেকে শাসকের রক্তচক্ষু মায় রাজ্য জুড়ে চলা নৈরাজ্যের কথা। সঞ্চালকের ভূমিকায়ও মঞ্চে দেখা গেল অভিনেতা বাদশা মৈত্রকে। সব মিলিয়ে বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখেই ব্যাটনটি যে এবার ‘তরুণ-তুর্কিদের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে তা বিলক্ষণ বুঝিয়ে দিলেন বিমানবাবুরা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news