ডম্বরুপাণি উপাধ্যায়:
মেদিনীপুরের মাটি শহিদ ক্ষুদিরামের মাটি।
শনিবার মেদিনীপুর কলেজ মাঠে বলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন তাঁর নিজের কায়দায়। তবে সে আক্রমণ চেনা, সে আক্রমণের ভাষায় নতুন কিছু নেই। সাম্প্রদায়িকতা, জিএসটি, ইত্যাদির চর্বিত চর্বণ। সভায় নতুন বলতে তৃণমূলের মিটিং-এ আশানুরূপ লোক না হওয়া আর মেদিনীপুরের বুকে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের একটি সভা, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপস্থিত, সেই সভা শুভেন্দুর নামে নয় অভিষেকের নামে প্রচারিত হওয়া। মোদির পাল্টা সভায় অভিষেককে সামনে এনেছেন দলনেত্রী। কেন এনেছেন? সে অন্য আলোচনা। তবে অভিষেককে সামনে এনে ফল যে আশানুরূপ হয়নি তা এখন বলা বাহুল্য। অভিষেকের বক্তৃতা চলা কালে সভায় আগত মানুষ মিটিংয়ের মাঠে না থেকে কাছের এলআইসি মোড়ের খাবারের দোকানে পেটপুজো করেছেন।
সে যাই হোক অতি নীরবে হলেও আর একটি ঘটনা ঘটে গেছে এই সভায়। তৃণমূল রাজনীতির সাম্প্রতিক ট্রেন্ড হল পরিবারতন্ত্র। সেই ট্রেন্ডের সামনে শুভেন্দু অধিকারীর আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কলেজ মাঠে! শহিদের মাটি মেদিনীপুর। শুভেন্দু এদিন প্রতিষ্ঠা করলেন শহিদের নতুন সংজ্ঞা। বোঝালেন শারীরিকভাবে জীবিত থেকেও শহিদ হওয়া যায়!
রাজ্যের দীর্ঘ বাম শাসনে বিরোধী রাজনীতির পরিসরটুকু প্রিয়-সোমেন-সুব্রতর পর ধরে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার ঝোড়ো ব্যাটিং বিরোধী রাজনীতির ময়দানে আর কাউকে দাঁড়াতে দেয়নি। মমতাকে ঘিরে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও সময় থেকে সময়ান্তরে তাঁকে সঙ্গত করে গেছেন। অজিত পাঁজার মতো অভিজ্ঞ কিংবা পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিচক্ষণ অথবা মুকুল রায়ের মত চাণক্য তাঁকে সার্পোট জুগিয়ে গেছেন। যাঁরা মমতা-নির্ভর রাজনীতি করিয়ে বা রাজনীতির পরগাছা, তাদের কথা এই আলোচনায় আসে না। ৯২-৯৩ সালকে যদি মমতার উত্থানের সময় ধরা হয় তাহলে বলা যায় প্রায় ১৬ বছর পেরিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে আর একজন যুবক মাথা তুলছিলেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। বুদ্ধিমান, সাহসী, পরিশ্রমী, মানুষের কাছে যাঁর আবেদন শুরু থেকেই নজর কেড়েছিল, তিনি শুভেন্দু। শুভেন্দু অধিকারী। কার্যত একার চেষ্টায় তিনি নন্দীগ্রাম আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন। মমতা সেখানে গেল অনেক পরে। তিনি ব্যস্ত ছিলেন সিঙ্গুর নিয়ে। তৃণমূল তখন অভিষেককে চিনত না। মমতার কোটায় হাতে ভিভিআইপি পাস নিয়ে অভিষেকের তৃণমূলাভিষেক। রাজনীতির প্রাঙ্গণে মেগা এন্ট্রি। কংগ্রেস ছেড়ে আসা মমতার কংগ্রেসেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে দলে পরিবারতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দেওয়া।
এই সময় পরগাছাদের কথা উল্লেখ করতে হয়। তারা দ্রুত বুঝে গেলেন দলে এবার ভাইপো-রাজ। তারা সহজে ভুলে গেলেন, ‘তৃণমূল স্তরে গিয়ে কংগ্রেসটা করব’ একসময় এই ছিল মমতার অঙ্গীকার। ইনডোর স্টেডিয়ামে কংগ্রেসের মিটিংকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ওরা ইনডোর আমরা আউটডোর।’ আউটডোর মানে? আউটডোর মানে সীমিত পরিধির বাইরে পড়ে থাকা অগণিত দলীয় কর্মীদের মধ্যে থেকে রাজনীতি করার কথাই সেদিন সম্ভবত বুঝিয়েছিলেন মমতা।
তৃণমূলে এসব এখন গল্প কথা। আউটডোর তো দূর দলের ক্ষমতার কেন্দ্র এখন নিজের পরিবারের মধ্যে এনে ফেলেছেন মমতা।
অভিষেকের রক্তে রাজনীতি আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজনীতিবিদের পার্সোনাল গাইডেন্সও হয়তো আছে। তবু যথেষ্ট অভিজ্ঞতার আগেই তিনি গুরুভার পেয়েছেন। তাঁর কাজটাও কঠিন।
সে যাই হোক। এসবের মধ্যে রাজ্য রাজনীতির যে বড় ক্ষতিটা হল, তা হল শুভেন্দুর মতো রাজনৈতিক সম্ভাবনার সমাপ্তি। যে গাছের মহীরুহ হওয়ার কথা সে নিজেই নিজেকে বেঁধে ফেলল একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায়! শুভেন্দুর অবস্থা দেখে ভবিষ্যতের রাজনীতিকদের কাছেও সম্ভবত ভুল বার্তা যাবে। তারা বুঝবে রাজনীতিতে লড়াই করে উঠে আসার কোনও মূল্য নেই! তার চেয়ে মামা কাকা (পড়ুন পিসি ) ধরে ঘাম রক্ত দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা রাজনীতির সাজানো বাগানে প্যারাস্যুটে করে নেমে টুপ করে খসে পড়াই ভাল!
আত্মবিস্মৃত শুভেন্দু শেষ কবে আয়না দেখেছেন, তাঁর কি মনে আছে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news