পার্থসারথি পাণ্ডা
মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ প্রভৃতি অবতারগ্রহণের সময় বিষ্ণু কারও গর্ভবাস করেননি। তাহলে কৃষ্ণ অবতারে তিনি কেন গর্ভবাসী হলেন?
আসলে, রামচন্দ্র বলুন, কৃষ্ণ বলুন কিম্বা বুদ্ধ—প্রতিটি অবতারজন্মের পেছনেই আছে গর্ভ সংক্রান্ত কাহিনী। রামের পিতা দশরথ অন্ধকের কাছে যখন পুত্রবিচ্ছেদ জনিত কষ্টে মৃত্যুর অভিশাপ পেলেন, তখনও দশরথ পুত্র তো দুরের কথা, কোন সন্তানেরই জন্ম দিতে পারেননি। শেষমেশ যজ্ঞজাত দৈব পায়েস খেয়ে রানিদের গর্ভ হয়েছিল এবং তাতেই রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল। বুদ্ধ অবতারেও বিষ্ণু জন্ম নিয়েছিলেন রাজার ঘরে। কিন্তু মাকে তিনি গর্ভযন্ত্রণা দেননি, মানুষকে যন্ত্রণাহীন এক মুক্ত জীবনের সন্ধান দেবেন বলে ‘তথাগত’ হয়ে তিনি নির্লিপ্তভাবে যেন গর্ভপথ দিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কৃষ্ণও রাজপুত্র, বসুদেবের রানি দেবকীর গর্ভজাত সন্তান। অষ্টম গর্ভে। তবে তাঁর জন্ম রাজপ্রাসাদে হল না, হল রাজার কারাগারে। সে কারাগার রাজা কংসের। এখানে গর্ভবেয়ে বিষ্ণু এলেন কংসের মৃত্যুর কারণ হয়ে। আর তাছাড়া এই গর্ভজাত অবতার নেওয়ার আর একটি কারণও রয়েছে। তা হল, জীবনচক্রের পূর্ণরূপ দেখানো। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ অবতার বিষ্ণু নিয়েছেন নিছক সৃষ্টিরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে, এঁদের বিস্তৃত লীলার কাহিনি পাওয়া যায় না। কিন্তু রাম, কৃষ্ণ বা বুদ্ধ অবতারের মধ্য দিয়ে বিষ্ণু দেখিয়েছেন যে, গর্ভজাত প্রতিটি প্রানির জীবনেই, ভগবানের অবতার হলেও, জন্ম-জরা-মৃত্যু আছে, জীবনের পথে কর্তব্য আছে, ভোগ আছে, ত্যাগ আছে।
কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল অষ্টমী তিথির রাতে। কংসের হাত থেকে শিশুপুত্রকে রক্ষা করতে বসুদেব চললেন গোকুলের উদ্দেশ্য। মায়াবলে খুলে গেল কারাগারের কপাট, প্রহরীরা মায়া নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ল। বসুদেব সদ্যজাত পুত্রকে কোলে নিয়ে যখন বাইরে বেরলেন, তখন বাইরে ঘন কালো রাত। মাঝে মাঝেই বিদ্যু চমকাচ্ছে, অষ্টমীর চাঁদ মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। পথ আর দেখা যায় না। পথ দেখানোর জন্য কথা থেকে হাজির হল এক শেয়াল। সেই শেয়ালের পিছু পিছু চলতে চলতে যমুনার তীরে হাজির হলেন বসুদেব। যমুনার একূল ওকূল জল, ছেলেকে নিয়ে পেরোবেন কী করে বসুদেব! এমন সময় মোজেসকে যেমন সমুদ্র পথ করে দিয়েছিল, তেমনি যমুনা পথ করে দিল বসুদেবকে। সাহায্য করল শিশু কৃষ্ণকে গোকুলে চলে যেতে। নদীর মাঝখানে বৃষ্টি নামল। ছাতা হয়ে ফনা মেলে পিতাপুত্রকে আরাল করল অনন্ত নাগ। অবশেষে গোকুলে নন্দগৃহে হাজির হলেন এসে সপুত্র বসুদেব। মায়াঘুমে সমস্ত গ্রাম আচ্ছন্ন। যশোদার সদ্যজাত কন্যাকে নিয়ে তার জায়গায় পুত্রকে শুইয়ে দিয়ে বসুদেব ফিরে এলেন কারাগারে। আচ্ছা, এই যে পুত্রকে গোকুলে দিতে গিয়ে কারাগার থেকে ক্ষনিকের মুক্তি পেয়েছিলেন বসুদেব, এই মুক্তির স্বাদ কি তিনি আস্বাদ করতে পেরেছিলেন? আসলে পুত্রের সুরক্ষার চিন্তায় তিনি এতটাই ব্যাকুল ছিলেন যে, আলাদা করে এই মুক্তির স্বাদ তাঁর কাছে ছিল না। কিন্তু পুত্রকে সুরক্ষিত জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর এই যে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে যাওয়া, এর মধ্য দিয়েই পূর্ণ হয়েছে তাঁর সমস্ত জীবনের পুত্রবাৎসল্য। কিন্তু মা হিসেবে দেবকী শুধু জন্ম দেওয়া ছাড়া কৃষ্ণের বড় হয়ে ওঠার সময় তাঁর ওপর বাৎসল্য ঢেলে দেবার সুযোগ আর কখনই পেলেন না। তাঁদের সঙ্গে কৃষ্ণের যখন সাক্ষাৎ হল, তখন কৃষ্ণ পূর্ণ যুবক। কেন এমনটা হল? আসলে, জন্মান্তরের পূর্বজীবনে বসুদেব-দেবকী বিষ্ণুর আরাধনা করে তাঁকে পুত্র হিসেবে চেয়েছিলেন, পুত্রের সঙ্গে আজন্ম কাটানোর বড় চাননি। তাই বিধির বিধান পেল দেবকীকে ভগবানের বাল্যজীবনের বাৎসল্য থেকে বঞ্চিত করতে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news