কমলেন্দু সরকার

নীল আকাশের নিচে নীল অন্ধকারে সাদা জাহাজটা এখন শুধু একজন ক্যাপ্টেনের কফিন। আর কিছু না। ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস যেন ভেতরে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে আছেন। ভেসে যাচ্ছেন তাঁর প্রিয় অলৌকিক জলযানে। আজ ১৯ জানুয়ারি তাঁর অলৌকিক জলযানে ভেসে গেলেন ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস চরিত্রের স্রষ্টা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়।
গতকাল সন্ধেবেলা প্রফুল্লদা বললেন, “অতীনের অবস্থা ভাল নয়। বাথরুমে পড়ে গেছে। ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে।” সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় আর অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জন্ম একই বছরে। ১৯৩৪।
আজ চলে গেলেন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকক জলযান’, ‘ঈশ্বরের বাগানে’, ‘উত্তাপ’, ‘কবির বউ’ ইত্যাদির লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। গদ্য কি করে কবিতা হয়ে ওঠে তা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা না-পড়লে বোঝা যাবে না। যেমন মানুষ ছিলেন সরল তেমনই লেখকও।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। সে-বছর ‘আনন্দলোক’ পুজোসংখ্যায় উপন্যাস লিখবেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিন তিনি লেখা দিয়েও গেলেন। দফতরে আসবার কারণেই তাঁর সঙ্গে আলাপ। প্রথম দিন তেমন কথাবার্তা হয়নি। বলতে গেলে সম্পাদক দুলেন্দ্র ভৌমিক মানে দুলুদার সঙ্গে কথা বলেই চলে গেছিলেন।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা চলে গেল কম্পোজে। এরপর প্রুফ দেখার পালা। উপন্যাসের নাম ‘দুই ভারতবর্ষ’। প্রুফ পড়তে পড়তে কিছু ব্যাপার চোখে পড়ে। দুলুদাকে জানালাম। দুলুদাকে বললেন, “অতীনদাকে একবার ফোন করে জানা।” তা ফোন করলাম। উনি বললেন, “কাল দুপুরের দিকে যাব।”
পরদিন এলেন দফতরে। এবার পরিচয় হল। অল্প সময়েই অতীনদা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ওঁকে ব্যাপারটা জানাতেই লেখার চরিত্রে অদলবদল করে দিলেন। বললেন, “তোমরা করে দিয়ো। আমি বই করার সময় ঠিক করে নেব।” ১৯৯৮-এ ‘দুই ভারতবর্ষ’-এর জন্য বঙ্কিম পুরস্কারও পান।
এরপর মাঝমধ্যেই আসতেন। কথা বলতে ভালবাসতেন। প্রচুর গল্প বলতেন। সেসব ছিল পুরনো দিনের। তাঁর কাছ থেকেই শুনেছিলাম অতীনদাকে বহুরকম কাজ করতে হয়েছিল। খালাসির কাজ থেকে জাহাজের নাবিক। সমুদ্রযাত্রার নানা গল্প। নানা ঘটনা। পরবর্তী কালে শিক্ষকতা। সেখান থেকে সাংবাদিকতা।
বাংলা সাহিত্যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখক খুব কম এসেছে। দেশভাগের ব্যথা তাঁর বুকে বাজত। ঋত্বিক ঘটকের মতো অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ভাবাতো, খারাপ লাগাতো। তাই তো তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে সেইসব ঘটনা, সেইসব কথা। নিপাট ভদ্রলোক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিলেন এক নিরহংকার মানুষ।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকজীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছে। সেই তালিকায় সাহিত্য অকাদেমিও রয়েছে। সিরাজদা একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, “নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ এক অসামান্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে।” এমনকী সিরাজদা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সঙ্গেও তুলনা টেনেছিলেন। অতীনদা নিজেই চলে গেলেন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। তা তিনি খুঁজে পেলেন কিনা জানি না। তবে পাঠকেরা ঘুরবেন ‘নীলকণ্ঠ পাখীর খোঁজে’।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news