তপন মল্লিক চৌধুরী:
মূর্তি ভাঙচুর ক্রমশই যেন ট্রাডিশন হয়ে উঠছে। ভেঙে গুড়িয়ে দাও, না হয় সাদা ধবধবে মূর্তির মুখে কুচকুচে কালো রং মাখাও। এই ভয়ঙ্কর পৈশাচিক ও বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডটি ঠিক কবে, কোথায় এবং কারা শুরু করেছিলেন সঠিক জানা নেই। তবে কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা থেকে বছর দেড়-দুই পিছিয়ে গেলেই দেখব মণিষীদের মূর্তি ভাংচুর করার যে রেওয়াজ গোটা দেশে শুরু হয়েছিল তা যেন মাঝপথেই ট্র্যাডিশনে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
দেশের সর্বত্রই পথের মাঝে অথবা ধারে কিংবা পার্কে যেমন, তেমনই স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটি এবং অন্যত্র মণিষীদের মূর্তি আমরা ঘটা করেই বসিয়েছি। কিন্তু খোলা জায়গায় বসানো অধিকাংশ মূর্তিই বছরভর কাক পক্ষিদের বিষ্ঠায় ভরে থাকে। কেবল তাঁর জন্মদিন অথবা মৃত্যু দিনের আগে সেটি কোনওরকমে পরিস্কার করা হয় তারপর যে কে সেই। কেবল তাই নয় বহু মণিষীর মূর্তি আছে যার কোথাও উল্লেখ নেই তাঁর নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। এমন বহু পার্ক বা বাগান আছে সেখানে মণিষীদের বাণী লেখা রয়েছে অগুনতি ভুল বানানসহ। অনেকেই হয়তো রে রে করে উঠবেন কোথায় কোথায় বলে। তার চেয়ে বরং নিজেদের নোংরামি আর ধ্যাষ্টামি নিয়ে একটু লজ্জিত হলে ভালো হয়।
দুষ্কৃতীরা লেনিনেই থেমে যায়নি। সুকান্ত ভট্টাচার্যকেও টুকরো টুকরো করেছে। দেশজুড়ে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠছিল। খেপে উঠছিল মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পরিস্থিতি দেখে অনেকেই বলছিল, বামিয়ানে তালিবানরা একটি মাত্র বুদ্ধ মূর্তি ভেঙেছিল। প্রশ্ন জেগেছিল তাহলে কি এরা কয়েক শত বা সহস্র মণিষীর মূর্তি ভাঙার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শ্যামাপ্রসাদের মূর্তিতেও কালি লেপন ও ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে তা বিকৃত করা হয়েছিল। তামিলনাড়ুর বিশিষ্ট বিজেপি নেতা এইচ রাজা বলেছিলেন, লেনিনের পর লক্ষ্য রামস্বামী পেরিয়ার। উল্লেখ্য, তামিলনাড়ুর দলিত আন্দোলনের নেতা ছিলেন পেরিয়ার। তাঁর হাত ধরেই ব্রাহ্মণ্যবিরোধী আন্দোলন পূর্ণতা পায়। এইচ রাজার বার্তা পেয়েই একদল রে রে করে ছুটে গিয়ে তামিলনাড়ুর ভেলোরে পেরিয়ারের মূর্তিকে আক্রমণ করে।

এসব ঘটনার পরপরই মেরঠে আম্বেদকরের একটি মূর্তি ভাঙা হয়। উত্তরপ্রদেশের ইলাহাবাদের ঝাঁসি এলাকার ত্রিবেণীপুরমের আম্বেদকর পার্কেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। একবার দু’বারের ঘটনাতেই দুষ্কৃতীরা ক্ষান্ত দেয় না। সংবিধান প্রণেতা, দলিত নেতা ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের মূর্তি ভাংচুর করে তার মুণ্ডচ্ছেদ করেছে দুষ্কৃতকারীরা। পরপর তিনবার আম্বেদকরের মূর্তি ভূলুন্ঠিত হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাম অবাম রাজনীতির পতাকা যারা এগিয়ে নিয়ে চলেন এবং শাসক ও সেই দলের প্রশংসায় যারা সবসময়েই পঞ্চমুখ সেই বাধ্য বুদ্ধিজীবীরাও নিন্দা জানায়। কিন্তু তারপর?
সেচ্ছাচারী-সৈরাচারী-ব্যাভিচারী-ফ্যাসিবাদী সারমেয় শাবকেরা ভাঙচুরের নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে এবং তা বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট থাকে। মূর্তি ভাঙার রেশ পৌঁছয় মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে। জব্বলপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাদা মূর্তিতে প্রথমে লাল রঙ লাগানো হয় এবং পরে সেটা ভেঙে ফেলা হয়। এরপরই কলকাতার রাজাবাজার এলাকার নারকেলডাঙার ক্যানাল ইস্ট রোডে নেতাজির মূর্তিতে ভাঙচুর চালায় দুষ্কৃতীরা। কেবল ভাঙা নয় পাশাপাশি বোমা দিয়ে মূর্তি উড়িয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গত দু’দিন যে দল ও তার বিশ্বস্ত অনুগামিরা বিদ্যাসাগর মূর্তি ভাঙা নিয়ে চিৎকার করে গলার শিরা ছিড়ে ফেলার উপক্রম করলেন, রাজপথে অনেকটা হাঁটলেন, ঘাম ফেললেন, বিসলেরি ওয়াটার পান করলেন, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা উচ্চারণ করলেন। কোথায় ছিলেন সেদিন? কোথায় ছিল আপনাদের প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মিছিল? কিছুই ছিল না সেদিন। কারণ সেদিন ভোট ছিল না।

কোথায় থাকেন আপনারা? জানেন কী ভাস্কর নাগেশ যোগলেকরের হাতে গড়া এই পাঁচমাথার মোড়ের নেতাজী মূর্তিটি বারোমাস রাজনৈতিক -অরাজনৈতিক -বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্রে ঢেকে থাকে। দেখে মনে হয় এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে না। আমরা আমাদের জাতীয় বীরের মূর্তির চার পাশকে বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করছি। আপনাদের কী কোনও প্রতিক্রীয়া হয়? আপনারাই গর্ব করে দৃপ্ত ভঙ্গীতে বলেন, না হয় না।
মনে পড়ে …শরৎ বোস রোডের বাড়ি সংস্কারের সময় দল বেধে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন কোন সিন্ডিকেট থেকে বালি-সিমেন্ট ইত্যাদি আসছে? নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর পরিবার যখন সে বাড়ির গুরুত্ব-মর্যাদা-ঐতিহ্য আপনাদের বোঝাবার চেষ্টা করেন তখন ‘সুভাষদা’কে পার্টি অফিসে দেখা করার হুমকি দিয়ে আসেন! আজ হটাৎ আপনারা বিদ্যাসাগরে এত ব্যাথিত বোধ করছেন কেন? কেন আপনাদের দলের বাধ্য বুদ্ধিজীবীরা বিদ্যাসাগরের জন্য কুম্ভীরাশ্রু ফেলছেন?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news
সঠিক সময়ে সঠিক লেখা।
গেরুয়াধারীদের উল্লাশের মধ্যেও কিন্তু প্রশ্নগুলি হারিয়ে যায় নি।