রণবীর ভট্টাচার্য
স্কুলজীবন শুরু থেকেই সিলেবাসে কি আছে আর সিলেবাসে কি নেই, তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এসেছে সারা বিশ্ব জুড়ে। কিন্তু করোনা ভাইরাস সিলেবাসের বাইরে থেকে আসা এমন এক প্রশ্ন, যার আপাতত উত্তর নেই কারোর কাছে। কিন্তু আবার, এই প্রশ্নের কোন বিকল্প বা অপশন নেই। শেষ ছয় মাসে, জনতা কারফিউ পরবর্তী সময়ে বদলে যাওয়া জীবনে স্কুল এসে দাঁড়িয়েছে স্মার্ট ফোনে। আগে স্কুলে মোবাইল ফোন নিয়ে গেলে শাস্তি পেতে হতো, আর এখন ডেটা সহ স্মার্ট ফোন না থাকলে পড়াশোনা বন্ধ। এর মধ্যেই আরো একটা শিক্ষক দিবস, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রদ্ধা জানানো রয়েছে, কিন্তু ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক – শিক্ষিকাদের মুখোমুখি দেখা বন্ধ। এরকম কে ভেবেছিল প্রাক করোনা পর্বে?
অনলাইন পড়াশোনা নতুন নয়, Coursera, Udemyর হাত ধরে অনেকেই দেখে ফেলেছে এইসব। কিন্তু এই মন খারাপের ঘরবন্দির মধ্যে যখন স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে টুলের উপর বই আর তার উপর স্মার্ট ফোন, এরকম করে ক্লাস চলছে ঘরে ঘরে – শৈশবটা যেন সত্যি চিরকালের মতো পাল্টে দিল। দুষ্টুমি নেই, অযথা প্রশ্ন কিম্বা টয়লেট যাওয়ার আবদার নেই – বাবা মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকোণ জুড়ে রয়েছে শিশুমনের উপর নজরদারি। ভ্যাকসিন এখনও অনেক দূরের ব্যাপার! আমেরিকা, ফ্রান্সের মত দেশ যারা তাড়াতাড়ি স্কুলের দরজা খুলে দিয়েছিল, তারা দেখেছে ভয়ানক পরিণতি। শুধু তাই নয়, ভারতের মতো দেশে, যেখানে বিশাল সংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তারা ছেলেমেয়েদের স্কুল পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন এবার। স্কুলের মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই অনেকেরই। কিন্তু উল্টোদিক নিয়ে ভেবেছি আমরা? আমাদের শিক্ষক শিক্ষিকারা কি ভালো আছেন? তারা মানিয়ে নিতে পারছেন কি এই করোনার চাপিয়ে দেওয়া ফরমানে?
ব্ল্যাক বোর্ড থেকে পেন ট্যাবলেট – এই রূপান্তর নেহাত সহজ নয়। ভারতে শুধু যে ছাত্রছাত্রীদের স্মার্ট ফোন নেই তা নয়, অনেক শিক্ষক শিক্ষিকারও নেই। বয়স্কদের ক্ষেত্রে রাতারাতি পুরো পদ্ধতি করায়ত্ত করা নেহাত সহজ নয়। অনেক বেসরকারি স্কুল এই পরিস্থিতিতে ৪০-৬০% মাইনে কেটে নিতে কার্পণ্য করছে না শিক্ষকদের। নতুন করে এর মধ্যে আছে নয়া শিক্ষানীতি যা আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত করছে ভারত জুড়ে। ডিজিটাল ভারতে পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু আর চিরকালীন ক্লাসরুম ভিত্তিক আর হবে না। এর ফলে হঠাৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছে অনেক শিক্ষক শিক্ষিকার ভবিষ্যত। খাস পশ্চিমবঙ্গেই প্রচুর ছেলেমেয়ে প্রাইমারি, উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পড়াবার স্বপ্ন দেখেন। একদিকে করোনা আর অন্যদিকে নতুন শিক্ষানীতি, সব মিলিয়ে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে পরিস্থিতি।
বাজার অর্থনীতিকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। ভালো লাগুক কিম্বা খারাপ, শিক্ষা বাজার অর্থনীতির অন্যতম একটি পণ্য আজকের দিনে। কিন্তু এই ‘দামী স্কুল’, ‘ডাল ভাতের স্কুল’, ‘ভালো স্কুল’ – এই শব্দ চয়নের মধ্যে কোথায় যেন প্রশ্ন উঠে গিয়েছে শিক্ষার সাথে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সম্পর্কের। বেসরকারিকরণ খারাপ এই জাতীয় ভাবনা না এনে বর্তমান পরিস্থিতি পরখ করা একান্ত আবশ্যক। আজও সমাজের প্রতিটি স্তরের সফল মানুষ এক বাক্যে স্বীকার করে নেন জীবনে শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভূমিকার কথা। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে? Teacher থেকে facilitator – এই পরিবর্তন কিন্তু ক্লাসরুমের ভালোবাসা, আবেগ, শেখা, স্মৃতি বাদ দিয়ে স্রেফ যন্ত্র নির্ভর আদান প্রদানের একটি অঙ্গ করে তুলতে পারে। করোনা অনেক ক্ষতি করে দিয়ে যাচ্ছে মানুষের কিন্তু শিক্ষায় যে পরিবর্তন এনে দিল, এর কি কোন সুরাহা হবে? যদি শিক্ষক শিক্ষিকাদের সম্মান আবারো ভূলুণ্ঠিত হয়, তাহলে আবার পিছন দিকে হাঁটবে শিক্ষা।
তাই এই শিক্ষক দিবসে একটিই প্রার্থনা, স্মার্ট ফোনও থাক, সাথে ক্লাসরুমও। আবারও যেন নতমস্তকে সেই ছোট্ট শিশু প্রণাম করতে পারে তার প্রাণের প্রিয় মাস্টারমশাই বা দিদিমণিকে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news