ডম্বরুপাণি উপাধ্যায় :
গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালির চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি ভোজন করে মমতার পারিষদবর্গ সরকারি খরচ কমানোর প্রদর্শন করলেন নবান্নে, বৃহস্পতিবার দুপুরে।
আম বাঙালির রোজের খাওয়া কি? গড় বাঙালি দুপুরের পাতে কি খায়? ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি আর একটা মাছ। আর কিছু? সকাল বেলা ঘরে ঘরে অফিসের ভাত বাড়া হয় কমবেশি এমন পদ দিয়েই। মধ্যবিত্তের এটাই তো রাজভোগ! দারিদ্র্যরেখার সামান্য ওপরে বা নিচে বসবাসকারী জনতার কথা নয় ছেড়েই দেওয়া গেল। মধ্যবিত্তের এই নিত্য রাজভোগ ‘মা মাটি মানুষের’ সরকারের মন্ত্রী-আমলারা গলাধঃকরণ করেন যখন তাদের ব্যয় সংকোচ করতে হয়!মমতার মন্ত্রীদের ব্যয়সংকোচজনিত কম আহারও অবশ্য সাধারণের আহারের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। বৃহস্পতিবার, নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে, দুপুরের মেনুতে ছিল ভাত, শুকতো, ডাল, আলুভাজা, আলু-ফুলকপির তরকারি, দই-পোনা, চাটনি, পাঁপড়, রসগোল্লা এবং দই। এতো নিম্ন মধ্যবিত্তের বিয়েবাড়ির মেনু! এই সুযোগে জেনে নেওয়া গেল ব্যয়সংকোচের সংকোচ(!) না থাকলে মন্ত্রী মহোদয়রা এমন বৈঠকের পরে কি মুখে তোলেন। দইপোনার মতো মাছের পদ ছাড়াও থাকে আরও দুই রকমের মাছের পদ। কখনও ভেটকি, কখনও বা কই, কখনও আবার পাবদা কিংবা চিতল কিংবা চিংড়ি। সঙ্গে দু’রকমের মাংস, পাঁঠা ও মুরগী। এই মহাভোজের তুলনায় বৃহস্পতিবারের মেনু যে নেহাৎ গরীব গন্ধ মাখা তাতে সন্দেহ নেই!
মুখ্যমন্ত্রী স্বল্পাহারী। এই চব্যচোষ্যে তাঁর কোনও সক্রিয় ভূমিকা নেই, সে কথা ধরা নেওয়াই যায়। তবু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়ও এড়ানোর নয়। মন্ত্রী-সান্ত্রীদের এ হেন ‘খরচা বাঁচানো’ খাবার যে সাধারণ মানুষকে এক প্রকার অপমান করা তা সম্ভবত অভাব ও জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মমতা জানেন! বুঝতে পারেন! অন্তত এমনটাই হওয়ার কথা।
সে যাই হোক, সরকারি আহারে লুকিয়ে থাকা মানুষের অপমান ছাপিয়ে খবরের জায়গাটি হল নিম্নরুপ :
ব্যয়সংকোচে কড়া পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ব্যয়সংকোচে কড়া হতে হবে আমাদের। পাবলিক সার্ভিসে আমরা কোনও কম্প্রোমাইজ করছি না। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মনে করান, কোটি কোটি টাকার দেনা রয়েছে, তাছাড়া ডিএ-র জন্য খরচ আছে, হাজারটা প্রকল্প রয়েছে। অতএব সরকারি খরচ কমাতে হবে যেভাবেই হোক। এও জানান যে, ব্যয়সংকোচের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে আমলাদের। উল্লেখ্য, কিভাবে রাজ্য সরকারের ব্যয় কমানো যায় তা নিয়েই ছিল মমতার মন্ত্রীদের এদিনের বৈঠক।

কিন্তু নবান্নের অন্দরে উঠে গেছে প্রশ্ন। বৈঠক ব্যয়সংকোচের আর সেখানে মমতার মন্ত্রীদের খাওয়াতে এত টাকা ব্যয়! এমন রাজকীয় খাবার খেয়েও কম খেলাম বলেন কী করে ওঁরা! তাহলে ধরে নিতে হয় যে মমতার মন্ত্রীরা গড় বাঙালির খাওয়া দাওয়ার খোঁজ রাখেন না। যদিও মমতার মন্ত্রীরা চেয়ারে বসেছেন এই গড় বাঙালির ভোটে জিতে এসে।
তাহলে?
নবান্নে কান পাতলে অন্য কথা শোনা যাচ্ছে। সেখানকার বক্তব্য হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে জেলায় জেলায় প্রচুর প্রশাসনিক বৈঠক হয়েছে (সে অনুষ্ঠানও লাইভ প্রচার পেয়েছে), সেখানে খরচে মোটেই রাশ টানা হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও ছিল রাজকীয় (সেই তুলনায় আজকের খাবার কিছুই না)। যা লোকের চোখে পড়েছে। উল্টো দিকে সরকারের মাথায় বিরাট অঙ্কের ঋণের বোঝার কথা মুখ্যমন্ত্রী সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দেন। দুই ঘটনায় সামঞ্জস্য থাকছিল না। তাই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাজনৈতিক মহল আরও তলিয়ে দেখতে চায় ব্যয়সংকোচ সংক্রান্ত আজকের বৈঠককে।

তাঁদের মতে, গত এক বছরে টিএমসি সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। সে কথা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মুখ্যমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি জানেন। তাই তিনি জনতার চোখ ঘোরাতে চাইছেন। পঞ্চায়েত ভোটে রাজনৈতিক হিংসা, বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় হাজার হাজার আসন জয়, যা নিয়ে সম্প্রতি আদালত প্রশ্ন তুলেছে, এরপর ভাগাড়-কান্ড, পচা মুরগি কান্ড এবং অতি সাম্প্রতিক কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় তোলাবাজি নিয়ে সরকার জেরবার। এমত অবস্থায় বাস্তবিক ব্যয়সংকোচ না করা গেলেও মমতার মন্ত্রীদের ব্যয়সংকোচের মতো বৈঠকের দরকার ছিল। দরকার ছিল এই সিদ্ধান্ত পাবলিককে জানানো, দরকার ছিল নবান্নের মেনুতে কিছুটা হলেও রাশ টানা। সবচেয়ে বড় কথা ব্যয়সংকোচের প্রচুর প্রচার প্রয়োজন ছিল। যা বেশ ভালোই হল বৃহস্পতিবার।
তবে প্রশ্ন উঠল গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে বেশি খেয়ে মমতার মন্ত্রীদের এই ব্যয়সংকোচের প্রদর্শনী কী হাস্যকর নাটক হয়ে দাঁড়াল না!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news