রণবীর ভট্টাচার্য
দেশ জুড়ে লকডাউন জারি হওয়ার পর যখন এই সিনেমার ডিজিটাল রিলিজের কথা বলেছিলেন পরিচালক সুজিত সরকার, অনেকেই হাহুতাশ করেছিলেন। কেউ কেউ যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তবে প্রথমবার ভারতে কোন পুরোদস্তুর সিনেমার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করার দিক থেকে ইতিহাসে নাম লিখে নিল ‘গুলাবো সিতাবো’ (Gulabo Sitabo)। আর তার সাথে আপামর দর্শকের যে মন ছুঁয়ে গেল অমিতাভ বচ্চন ও আয়ুষ্মান খুরানা অভিনীত এই সিনেমা, তা বলতে দ্বিধা নেই।
লখনউ মানেই মুঘল স্থাপত্য, টুকটুক, উর্দু শায়রি কত কিছুই যেন ভেসে আসে। সাবেক উত্তরপ্রদেশের এই শহরের কোন এক ফতিমা মহল এই সিনেমার প্রধান চরিত্র। এই ফতিমা মহল যেই সেই বাড়ি নয়, দেখলে মনে হয় যেন জমিদারবাড়ি, আপামর বাঙালিরা এর সাথে উত্তর কলকাতার ক্লান্ত, অবসাদে ভোগা পুরনো জমিদারবাড়ির মিল পাবেন। এই মহলের মালিকানা ৯৪ বছর বয়সী বেগমের হলেও বকলমে সব সামলানোর ভার মির্জা চুন্নান নবাবের। নামে নবাব হলেও আদতে পাগলাটে, প্রায়ই হাতসাফাই করা অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bacchan) অভিনীত এই চরিত্রের মূল লক্ষ্যই হল নিজের থেকে বছর পনেরোর বড় বেগমের মৃত্যু হলেই এই ফতিমা মহলের দখল নেওয়া আর নাম মাত্র ভাড়াতে থাকা ভাড়াটেদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করা।ভাড়াটেদের মধ্যে বাঁকে রাস্তোগী অদ্ভুত এক মানুষ – তিন বোন আর মা-কে নিয়ে সংসার আর একটা ছোট্ট দোকান। কিন্তু ভাড়া দেওয়ার বেলায় ভীষণ গরিব, তাই সাপে নেউলে সম্পর্ক মির্জার সাথে। বাঁকে রাস্তোগী আর সমস্ত ভাড়াটেরা কি আজীবন থেকে যেতে পারবে ফতিমা মহলে না বেগমের মৃত্যুর পর মির্জা মালিক হয়ে যাবে? জানতে হলে অবশ্যই সিনেমাটি আমাজন প্রাইমে দেখতে হবে।
যেখানে পরিচালক, সুরকার আর ক্যামেরার পিছনের মানুষ বাঙালি, সেখানে আবেগ, ভালোলাগা, মন খারাপ তো থাকবেই! জুহি চতুর্বেদীর স্ক্রিপ্ট সিনেমাকে দীর্ঘায়িত করেছে অনেকটা, যা নিঃসন্দেহে আরেকটু মেদহীন হতেই পারত। তবে অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায় রাজসিক লখনউ ধরা দিয়েছে সুন্দর ভাবে। টুকটুক করে শহর ঘুরে দেখার সুযোগ তো থাকছেই তার সাথে ফতিমা মহলের প্রতিটি আনাচে কানাচে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিটি ফ্রেমে। বাঁকে রাস্তোগীর বোনের চরিত্রে সৃষ্টি শ্রীবাস্তব এই সিনেমায় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। তবে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন! ঠিক যেই দাপটে সুজিত সরকারের পিকু সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, এখানেও যেন সেই ফর্মে! গালি বয়ের মুরাদের অত্যাচারী-অসহায় বাবা অভিনেতা বিজয় রাজ এখানে আর্কিওলোজিক্যাল সার্ভে ওফ ইন্ডিয়ার পদস্থ কর্মচারী হিসেবে যথাযথ।ব্রিজেন্দ্র কালার আইনজীবীর চরিত্র বেশ কমিক রিলিফ দেয় সিনেমায়। অভিনেতা আয়ুষ্মান খুরানা (Ayushman Khurana) তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সাবলীল অভিনয়ে। কেন যে তাকে দেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে ভাবা হয়, তার অন্যতম উদাহরণ এই সিনেমায় বাঁকে রাস্তোগী চরিত্রে তার অভিনয়।
অনীক দত্তর অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা ভূতের ভবিষ্যতের কথাও দর্শকের মনে পড়তে পারে এই সিনেমায়। ভূত নেই, তাই বলে কি প্রমোটারের হাত থেকে বাঁচবেনা ফতিমা মহল? গুলাবো সিতাবোর নারী চরিত্রগুলো ব্যতিক্রমী হিসেবে অবশ্যই মনে থেকে যাবে। ফতিমা মহলের প্রতিটি নারী যেন স্বতন্ত্র। বেগমের চরিত্র থেকে বাঁকে রাস্তোগীর ছোট বোন অথবা পূর্ণিমা শর্মা অভিনীত ফৌজিয়া – সমাজের পরিচিত ঘেরাটোপ পেরিয়ে এই চরিত্রগুলো সিনেমার সম্পদ হয়ে গিয়েছেন।ফারুখ জাফরের অভিনীত বেগম এই সিনেমার শেষার্ধে একাই যেন সমস্ত আলো শুষে নিয়েছেন। এই ছবি শুধুমাত্র একটি স্যাটায়ারধর্মী গল্প বলাই নয়, তার সাথে লখনউয়ের ক্যানভাসে হারিয়ে যাওয়া অনেক ফতিমা মহলের কাব্য। তাই চিরাচরিত বাণিজ্যিক সিনেমা না হয়েও দর্শকের কাছে গুলাবো সিতাবো এক অন্য ধাঁচের পুতুলনাচের ইতিকথা হয়ে মনে থেকে যাবে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news