Breaking News
Home / TRENDING / রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাৎসন্যায়, চাপা পড়ল দ্বিজেন্দ্রগীতি!

রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাৎসন্যায়, চাপা পড়ল দ্বিজেন্দ্রগীতি!

কিশোর ঘোষঃ

আজ ১৯ জুলাই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মদিন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মানে মহীরুহ বাঙালি জিনিয়াস। অসংখ্য গান, কবিতা, নাটক। অথচ আমরা তাঁকে ভুলে গেছি! আমাদের ২৫ বৈশাখ মনে থাকে, এমনকী ২২ শ্রাবণও ভুলি না। কিন্তু ১৯ জুলাইকে মোটে পাত্তা দি না। তবে আধুনিক বাংলাগানের অন্যতম ভগীরথ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে ভুলে যাওয়ার অনেক কারণ আছে। এমনকি পরোক্ষে অন্যতম কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আরও স্ট্রেট ব্যাটে খেললে—রবীন্দ্রসঙ্গীত।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের তলায় অনেক, অনেকেই চাপা পড়েছেন। একা দ্বিজেন্দ্রলাল নন। নাম আসবে অতুলপ্রসাদ, এমনকি নজরুলেরও। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে মনে পড়ল—আমরা স্কুলের প্রেয়ারে যেমন ‘জনগণমন’ গাইতাম তেমনি দ্বিজেন্দ্রলালের ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ও গাইতাম। স্বদেশ চেতনার গান হিসেবে এই সঙ্গীত যে দুর্দান্ত তা আর বলে দিতে হয় না। কিছু গান আছে না, যা শুনলেই রোম খাড়া হয়ে যায়। কিছু করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় ‘ডু অর ডাই’-ই হল সেরা মানবমন্ত্র। যেমন অতুলপ্রসাদের ‘উঠো গো ভারত-লক্ষ্মী’। দ্বিজেন্দ্রলালের আরেক গান—‘বঙ্গ আমার! জননী আমার!’ শুনলে যার অন্তরে দেশাত্মবোধ জাগে না সে বাঙালি না, ভারতীয় না।

তা বলে দ্বিজেন্দ্রলাল কেবল দেশমাতৃকার পুজোই করেননি সঙ্গীত মাধ্যমে। অসংখ্য প্রেমের এবং হাস্যরসের গানও লিখেছেন। অপূর্ব এক প্রেমের গানের উদাহরণ হতে পারে ‘মলয় আসিয়া ক’য়ে গেছে কানে, প্রিয়তম তুমি আসিবে’। কিংবা ‘এসো এসো বঁধু বাঁধি বাহুডোরে, এসো বুকে ক’রে রাখি’। তেমনি মজার গানের বাদশা তিনি। তরুণ বয়সে বিয়ের পরেই লিখে ফেললেন, ‘প্রথম যখন বিয়ে হল/ ভাবলাম বাহা বাহা রে!’ ইত্যাদি। যাই হোক, আজকের লেখায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সঙ্গীত আলোচনা করতে বসিনি আমি। নিজেকে সে কাজের যোগ্য বলেও মনে করি না। বলতে এসেছি তাঁর চাপা পড়ার কথা। কীভাবে ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসঙ্গীত হাঙর হয়ে খেয়ে ফেলল আধুনিক বাংলা গানের অন্য মণিমুক্তদের।

এর পেছনেও রাজনীতি আছে। না, রবীন্দ্রনাথ পলিটিক্স করে দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুলদের সরিয়ে দেননি। কিন্তু তিনি স্বাধীনতাপূর্ব এলিট রাজনীতির মঞ্চে কবি হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন স্বমহিমায়। সেই রাজনীতির মঞ্চ কাদের ছিল তা আর বলে দিতে হয় না। উল্লেখ্য, এখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছোট করা হচ্ছে ভাবলে আপনি গাধা। সবার মতো আমিও জানি, বাঙালির জন্য বাংলা আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ উপহার তখনও যেমন এখনও তেমনি রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু এও সত্যি, যে পরোক্ষে মাৎস্যন্যায় ঘটে গেছে।

নোবেল পাওয়া কবি রবীন্দ্রনাথ যত বড় হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতও তত এলিট ক্লাসের তোষন ও পোষন পেয়েছে। ওই এলিটরা আপন স্বার্থে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গোড়ায় যত জল ঢেলেছেন তার একশো ভাগের এক ভাগ মমত্ব দেখাননি  দ্বিজেন্দ্রলালের গানের প্রতি। এবং নিঃশব্দে গ্রহণ ও বর্জনের খেলা চলেছে। এরপর রবীন্দ্রনাথ গড়লেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গীতভবন হল। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শেখানো শুরু হল ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রসঙ্গীত। অপরপক্ষে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ক্রমশ ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে থাকলেন। তার পাশে কোথায় দাঁড়ায় দ্বিজেন্দ্রলাল! কারণ এবার গুরুদেবের গান তাঁর শিষ্যেরা পরম্পরায় ছড়িয়ে দিতে থাকবেন দিকে দিকে। এই সঙ্গে মনে পড়বে শান্তিদেব ঘোষ, পঙ্কজকুমার মল্লিকদের মতো অনেক অসাধারণ শিল্পীদের কথা। যার পরবর্তী প্রজন্ম সুচিত্রা মিত্র, কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখ। এরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পাবলিক সঙ করে তুললেন। যদিও সেই পাবলিক আজও রবীন্দ্রসঙ্গীত বোঝেনি। পাবলিক মেয়েকে বিয়ে দেবে বলে শিখিয়েছে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, পাজামা-পাঞ্জাবি পরে পাড়ার ফাংশান-মঞ্চে ওঠার লোভে বেসুরে গেয়েছে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। শাপে বর হয়েছে—বেলেল্লাপনা হয়নি দিজেন্দ্রলালের গান নিয়ে। কারণ তেমন হিট গায়ক জোটেনি দ্বিজেন্দ্রগীতির কপালে। এমন একজন গায়ক যে আপামর শ্রোতাকে চুম্বকের মতো কাছে টানবে প্রকৃত গভীর সঙ্গীত পরিবেশনায়। ফলে দ্বিজেন্দ্রলাল শুনিনি আমরা। যে কারণে বস্তির ছেলে ‘রাম্মা-হো’, ‘কাঁটা লাগা’ কিংবা ‘টুনির মা’ শুনতে শুনতে বড় হয়, সেই কারণেই তার হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, ভীমসেন যোশি কিংবা শিবকুমার শর্মা শোনা হয় না। বুঝতে হবে এই যুক্তি। একই কারণে আমাদের ছোটবেলারও দ্বিজেন্দ্রলালের গান শোনা হয়নি। রাজনীতি ও সমাজনীতি কেবলই রবীন্দ্রসঙ্গীত ইঞ্জেক্ট করেছে। সবটা শুনলে কী ক্ষতি হত? ছোট থেকে আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের মতো করেই দিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুল শুনতাম? তারপর কান পেকে উঠলে গ্রহণ বর্জন করতাম নয়!

অতএব দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শান্তিনিকেতনের মতো, কলাভবনের মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ইন্সটিটিউশন থাকলে কী হত তা বলা মুস্কিল। রবীন্দ্রনাথ যদি নোবেল প্রাপ্ত গুরুদেব না হতেন তা হলে কী হত সেও এক প্রশ্ন। যদি পঙ্কজকুমার মল্লিকের মতো কোনও গায়ক-প্রতিভা দ্বিজেন্দ্রলালের গান গাইতে আসতেন তা হলে আজকে পরিস্থিতি কী দাঁড়াত তা বলাও মুস্কিল। এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে যদি রাজনীতি না হত?

যাক গে আসল কথা হল, রবীন্দ্রনাথ যে ভালো বিক্রি হয় তা ফুটপাথের ফটো বিক্রেতাও জানেন। তাই রবীন্দ্রসঙ্গীতকেই বাছা হবে ট্রাফিক সিগন্যালে বাজানোর জন্যে।

হায়, সেও রবীন্দ্রনাথ ও সাধারণ পথিকের জন্য এক ভয়ঙ্কর অত্যাচার সরকারকে তা কে বোঝাবে!

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *