দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় :
আমায় যদি কেউ ব্যক্তিগত ভাবে জিজ্ঞাসা করে (কেউ করবে না, তবু) তাহলে আমি বলব আজানের সুর আমার বেশ লাগে। ভোরের গাঙ্গেয় বাতাসে যখন এই সুর ছড়িয়ে পড়ে সেই সময় আমি ঘুম থেকে উঠি। শব্দার্থ তো বুঝি না, যাতে বোঝার কিছু নেই, শুধু অনুভব করার আছে, সেই সুর প্রাণে অনুভব করি। এই সুর যেখানে ভাসে, সেখানে সনাতন বা ইসলাম নেই। সেখানে সাকার বা নিরাকার নেই, সেখানে অস্তিত্বের আদিকে বন্দনা করা আছে, বিপুল এই অস্তিত্ব কে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করার প্রেরণা আছে।
আমি একজন সনাতনী। আমার ধর্ম মূলতঃ নিরাকার ব্রহ্মের কথা বলে। নিরাকারের প্রকাশে তেত্রিশ কোটি দেবতার কথাও বলে। শক্তি এক, প্রকাশ বহু। শক্তি যদি বিদ্যুৎ হয়, প্রকাশ আলো, পাখার হাওয়া, এসির বাতাস, টিভির সিরিয়াল, গিজারের গরম জল! আমার ধর্ম বলে, যেমন ভাব তেমন ভগবান। এই বাক্যটিতে কিন্তু পরিস্কার ভাব থেকেই ভগবানের জন্ম। কিন্তু ঈশ্বর? সেই পরম শক্তি কিন্তু একই।
রামপ্রসাদ সেই কবে লিখে গেছেন,
“মগে বলে ফারা তারা
গড বলে ফিরিঙ্গি যারা
খোদা বলে ডাকে তোমায়
মোঘল পাঠান সৈয়দ কাজী।”
নামে কি আসে যায়! তাছাড়া যাকে ডাকা হয় সে শোনা না শোনার অতীত, নাম দিয়ে তাঁকে ধরাও যায় না। ভক্ত ও জ্ঞানীর কাছে সে ঈশ্বর, আর্তের কাছে কালী দুর্গা গণেশ, কার্তিক ও আরও। সাধারণ নাস্তিকের কাছে সে ভাঁওতা, জ্ঞানী নাস্তিকের কাছে সে অস্তিত্ব।

আজানের সুর আর মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি যেখানে মেলে, বায়ুমণ্ডলের সেই স্তরে নীচুতলার ওইসব বাওয়াল নেই। সেখানে চণ্ডীপাঠের মূর্ছনাতেও মধু, ক্যারলেও মধু, কৃষ্ণের ভজনেও মধু, আজানেও মধু।
তবে হলে কি হবে, সেই স্তরে উঠে গেলে তো আর করে খাওয়া হয় না। ধর্মের ব্যবসা, রাজনীতির দোকানদারি, সেখানে সবেতেই লকডাউন। নীচুস্তরে, কারও আজানের সুর কানে কড়া লাগে, কেউ হনুমান চাল্লিশায় ভুত দেখে।

তবে এইসব কিছু পাশে সরিয়ে ভারতের বিখ্যাত গীতিকার জাভেদ আখতার বলেছেন, লাউড স্পিকারে আজান বাজানো হারাম। প্রত্যাশিত ভাবে প্রতিবাদ এসেছে। নীচুস্তরে যেমন প্রতিবাদ মানায় তেমন প্রতিবাদ। আশ্চর্য প্রেমিক এই কবির কথায় বিজেপির ছোঁয়াচ পেয়েছেন মিম নেতা সৈয়দ আসিম ওয়াকার। আসিম বলেছেন, কোনও এক সভায় নাকি আখতারের বক্তব্যে বিজেপি নেতারা হাততালি দিয়েছিলেন। তাই এমন বক্তব্য কবির। আখতার যে কারনেই বলে থাকুন না কেন, কুরাণ উচ্চস্বরে আজান কে নাকচ করুক বা না করুক, আজান হোক বা ভজন, ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও মানুষের কানে তা খারাপ লাগা সুস্থতার লক্ষন নয়। ধর্মাচরণ প্রকাশ্যে হবে কি হবে না, এমন কোনও বিতর্ক হলে অবশ্য আলাদা কথা। ধর্মকে জীবনশৈলী হিসেবে অনুধাবন করতে পারলে কিংবা ধর্মবোধে মহাজীবনের চেতনা উপলব্ধি করতে পারলে, এই গোল টুকুও থাকে না।

শুনছি করোনা পরবর্তী সময়ে দুনিয়ায় অনেক বদল আসবে।
ক্ষুদ্র সীমায়িত ভাবনা পেরিয়ে বৃহৎ সীমাতীত ভাবনায় মানুষ উত্তীর্ণ হবে… এমম বদলও যদি আসত!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news