রণবীর ভট্টাচার্য :
দেশীয় রাজনীতি এখন তুঙ্গে ভ্যাকসিন নিয়ে। একদিকে ওড়িশার মত রাজ্য ভ্যাকসিন কিনবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে আবার কর্ণাটক, ঝাড়খণ্ডের মত রাজ্য হয়তো খুব শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেবে। ভারতের গরীব আটটি রাজ্য শেষমেষ নিজেদের ৩০% স্বাস্থ্য বাজেট খরচ করবে ভ্যাকসিনের জন্য। ভুললে চলবে না যে বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মধ্য প্রদেশ, ওড়িশা, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশের মত সরকার আগেই ঘোষণা করেছে যে ১৮ থেকে ৪৪ বছরের সকলকেই বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।এর ফলে ভ্যাকসিন রাজনীতি কোন দিকেই এগোবে তা ঠাহর করা নেহাত সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্য যেখানে উষ্মা প্রকাশ করেছে, কেন্দ্রীয় ‘অভিসন্ধিমূলক ভ্যাকসিন রাজনীতি’ নিয়ে, এই অবস্থায় কি করবে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার, তাই নিয়ে সব মহলই তাকিয়ে। কিন্তু এই অবস্থা কেন??
বাজার অর্থনীতি বড় নির্মম, আর তার মায়াজাল থেকে বেরনো অসম্ভব বটে। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারত যখন কাবু, গণচিতা আর গঙ্গায় বহমান মৃতদেহের সারি দেখে ভারত যখন দুঃখিত ও লজ্জিত, তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট’ কঠিন প্রশ্নপত্রের সম্মুখীন হয়েছে। ইজরায়েলের মত দেশ যারা ‘মাস্কহীন’ হওয়ার সাহস দেখাতে পেরেছে, তারাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে সকলের ভ্যাকসিন না নেওয়া অবধি রক্ষা নেই। এদিকে ভারতে ভ্যাকসিন নিয়ে টালবাহানা অব্যাহত। ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে অনেকেই দুটি ডোজ পাননি, অনেকে প্রথম ডোজ পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পাননি। তার উপর ১৮ থেকে ৪৫ বছরের ভারতবাসীর জন্য কোউইন পোর্টাল যেরকম লাগামছাড়া ভাবে জেরবার হয়েছে রেজিস্ট্রেশনের সময়, তাতে সমস্যা ও বিভ্রান্তি উভয়েই বেড়েছে। এরই মধ্যে দেশীয় ভ্যাকসিন কোভ্যাক্সিন যখন ২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য ট্রায়াল শুরু হয়েছে, তখন সবার মুখেই এক প্রশ্ন – সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউ আসার আগে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ভ্যাকসিনের দুই ডোজ পাবে তো?
কি হল? কি হওয়ার ছিল? কি হতে চলেছে?
একেবারে শুরুর দিকে যখন কোভিড ছিল শীতঘুমে, তখন রাজনৈতিক ও ক্ষমতাবান লোকের সোশ্যাল মিডিয়ার ছবির মাধ্যমে দেশবাসী করোনা বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভরসা পেয়েছিল ভ্যাকসিনে। প্রশ্ন উঠেছিল যে কোন রাজ্য বিভিন্ন লপ্তে কতগুলো করে ভ্যাকসিন পাবে। পাঁচ রাজ্যের ভোটে অসম ও পুদুচেরি ছাড়া যখন বিজেপি ভালো ফল করতে পারল না, তখন এই উদ্বেগ রাজনৈতিক গতি পেল। অ-বিজেপি রাজ্যগুলো বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে হিসেবের খাতা দেখতে চাইল। এর মধ্যে আরো গুরুতর প্রশ্ন উঠল যখন সরকার ভ্যাকসিনের দাম নিয়ে জানাল।বাজেটে যখন ৩৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছেই, তখন দেশের সবাই বিনামূল্যে ভ্যাকসিন পাবে না কেন, এই প্রশ্নের সম্মুখীন হল। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, কেরল – কোভিডে জর্জরিত রাজ্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল যে কেন ভ্যাকসিন বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না।
গত বছরের শেষ থেকে যখন ভ্যাকসিন মৈত্রীর প্রয়াস হিসেবে পাশের রাজ্য বাংলাদেশ থেকে ভিভ রিচার্ডসের ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ভ্যাকসিন পৌঁছে দিয়েছে, তখন প্রশ্ন উঠেছিল ভারতের নিজের নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন রেখেছে তো! যখন দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কম ছিল, তখন প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু এই মড়কের মধ্যে এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর সরাসরি নেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।
ভ্যাকসিনের ফর্মুলা কি খোলাবাজারে দেওয়া উচিত?
এই প্রশ্ন করেছিলেন দিল্লির মুখমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ইতিমধ্যেই ফাইজার, জনসন এয়ন্ড জনসন, রাশিয়ার স্পুটনিকের মত অনেক ভ্যাকসিন নির্মাতারা অপেক্ষা করে আছে বিশাল ভারতীয় বাজারের জন্য। যদি কেন্দ্রীয় সরকার অনুমতি দেয় পর্যাপ্ত ট্রায়ালের পর, তাহলে রাজ্যগুলো কি সরাসরি কিনবে না কেন্দ্র কিনে রাজ্যগুলোকে পাঠাবে ভ্যাকসিন? যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই প্রশ্নের জুতসই উত্তর দেওয়া নেহাত সহজও নয়। এখানেই সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
গত ৯ই মে, কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া একটি হলফনামায় জানিয়েছিল যে রাজ্য গুলো ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থাগুলোর থেকে একতরফা ভ্যাকসিন কিনতে পারবে না। কারণ সেই অবস্থায় কোন রাজ্য বেশি, কোন রাজ্য কম – এরকম হলে ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এক অস্বাস্থ্যকর অসাম্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে জানিয়েছে যে রাজ্যগুলো নিজেদের পছন্দমত সংখ্যার ভ্যাকসিন কিনতে পারে।
তাহলে কি সামনের দিনে কোন একটি রাজ্যের মানুষ আরেকটি রাজ্যে যাবে দ্রুত ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য? এর উত্তর সামনের দিনে পাওয়া যাবে। তবে বলাই বাহুল্য, ভারতের তথা কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট কিন্তু সত্যি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news