মূল হিন্দি রচনা: শরদ জোশী
অনুবাদ : পার্থসারথি পাণ্ডা
দেশটা পড়ে আছে ভুক্তভোগী রোগী হয়ে। যখনই সে লম্বা একটা হাঁফ টেনে ওঠার চেষ্টা করে, তখনই আমরা আশায় বুক বাঁধতে শুরু করি। কিন্তু আশায় ছাই দিয়ে সে আবার ধপাস করে পড়ে যায়। তাকে সুস্থ এবং সচল করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে কিছু মূর্খ ডাক্তার আর স্বল্প কিছু সুন্দরী নার্স। নার্সরা জানে শুধুই মেকিমার্কা মুচকি হাসতে আর দেশের মুখে থার্মোমিটার গুঁজে উত্তেজনার পারদ পড়তে! ডাক্তারেরা বোধহয় এটুকুও জানেনা। তবু তারা বিছানার পাশে এমন এক মুদ্রায় দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তারা এক একটি বিশিষ্ট কর্মবীর! দেখেই বোঝা যায়, তারা বেশ ঘোড়েলও। বোঝা যায়, ওদের আগ্রহ-উৎসাহে রোগী নেই, আছে শুধুই হাসপাতাল। এদের একমাত্র ইচ্ছে হাসপাতালটিকে নিরন্তর এই ধরনের হাসপাতাল করে রাখা এবং দেশ নামক রোগীটিকে এমনতরো রোগশয্যায় নিরবধি শুইয়ে রাখা।
হাসপাতালের বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে থাকে ওষুধের দালালেরা। তাদের সবার কাছেই আছে লোভনীয় সব প্যাকেজ, আর আছে মোহনকথায় বেচু-সাহিত্য। তারা আশায় আছে, ডাক্তার তাদের ওষুধ এবার রোগীর নিদানপত্রে লিখবে। তাতে রোগীর হয়তো ঘন্টা হবে, কিন্তু কোম্পানির হবে বিলক্ষণ লাভ। ডাক্তারেরও। প্রতিটি ওষুধের ল্যাজেই তার পার্সেন্টেজ বাঁধা! কাজেই রোগীর টিমটিম সিচুয়েশন জারি থাকে। সে টিমটিম করে সিলিং দেখে।
আমরাও টিমটিম করে চেয়ে থাকি সেই দরজার দিকে, যে দরজা দিয়ে একদিন রোগীর সুস্থ হয়ে বেরিয়ে আসার কথা ছিল। আমরা রোগীর আত্মীয়, ফলে নিয়মমতো আমাদের মধ্যে ধৈর্য আছে, আশাও আছে। তবু মানুষের মন তো, বেশ কয়েকবারই মনে হয়েছে, আচ্ছা, আমাদের বোকা বানানো হচ্ছে না তো! কিন্তু আমরাও মানুষ তো, তাই তারপরই মনকে বুঝিয়ে ফেলি, এত এত ডাক্তারবাবু দেখছে, এত এত ওষুধ দিচ্ছে, মন্দের ভালো কিছু একটা নিশ্চয়ই হবে!
শয্যাশায়ী দেশটির সারা শরীরেই ব্যথা। মাথা থেকে পা সর্বত্র। তবে জয়েন্টে ব্যথা সবচেয়ে বেশি। যেখানে গুজরাট রাজস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়, কিংবা জম্মু কাশ্মীরের সঙ্গে। সর্বাঙ্গে ফোলা। কথা বলতে গেলেই কাশি আসে। এই অবস্থায় ডাক্তার আর বিজ্ঞ অ্যাডভাইজারেরা বার বার চার্ট দেখে এবং নিজেদের মধ্যে কনসাল্ট করতে থাকে। তাদের ফিসফিস দেখে মনে হয় যেন তারা এক বিরাট ষড়যন্ত্র ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে! তাদের কারও মনে হয়, দেশের রোগটার উপসর্গ আসলে পুরনো এলার্জি। আবার কারও মনে হয়, উপসর্গটার উৎস আসলে নতুন এক ভাইরাস। এমনই সব আন্দাজমতো নুনে পরিমাণমতো জলে মাখা সিদ্ধান্ত তাদের! শুয়ে শুয়ে রোগী সব দেখে। ডাক্তারগুলোকে তার মনে হয় সমবেত ভাইরাস, আর ওষুধগুলো মনে হয় এলার্জির ডিপো। রোগীর মনে হয় আসলে হাসপাতালটাই একটা মারাত্মক রোগ, যা তার শরীরে ঢুকে বসে আছে সমূলে।
আমরা যারা আত্মীয়, তারা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি, দেশের হাল ফিরবে কেমন করে? ডাক্তার জানিয়ে দেয়, বিশ্রাম বিশ্রাম, রোগীর বিশ্রামটাই আগে দরকার!
রোগী দেশ থেকে থেকেই কাতরে ওঠে। ডাক্তার তাকে ঘুমের ওষুধ দেয়। হাসপাতালের জানলার বাইরে নিরন্তর হট্টগোল চলে, কিন্তু কামরায় পর্দা থাকায় দেখা যায় না। কামরাকে পুরোপুরি বাতানুকূল রাখার জন্য কুলারের জায়গায় টিভি ফিট করা হয়। খবরের কাগজ পড়তে দেওয়া হয় সেদ্ধ করে। রোগীর প্রেসক্রিপশন থার্মোস্-এ রাখা হয়, রিপোর্ট রাখা হয় ফ্রিজে। রোগীর চিকিৎসার কামাই নেই, ডাক্তার মজুত সর্বক্ষণ! চোখ খুললেই রোগী দেখতে পায় ডাক্তারের নির্বিকার মুখে নিষ্কর্মার হাসি। তার অসহ্য লাগে।
আসলে ডাক্তারের একটাই ভয়, দেশ নিজে নিজেই কোনদিন রোগশয্যা ছেড়ে উঠে না পড়ে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news