পার্থসারথি পাণ্ডা

তখন সবে ‘ইন্টারভিউ’ ছবিটা রিলিজ করেছে। খুব স্মার্ট দুটি মেয়ে, কনভেন্টে পড়ুয়া টাইপ লুক, ছবিটা দেখে সিনেমা হলের দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একজন আর একজনকে বলছেন, ছবিটা নাকি তাঁদের ভালো লাগেনি। কারণ, ইটস আ অ্যান্টি-সোশ্যাল ফিল্ম। তাঁদের পিছনেই নামছিলেন মৃণাল সেন। প্রথম কথাটা শুনে তাঁর মনটা দমে গিয়েছিল। কিন্তু ছবিটা ‘অ্যান্টি-সোশ্যাল’ শুনে তাঁর মুখে ফুটে উঠেছিল চিলতে হাসি। ‘যাক, তাহলে কিছু একটা অন্তত বানিয়েছি!’
বাংলা সিনেমায় হাতে গোনা কয়েকটা ছবি দেখে মুগ্ধতার ভেতর থেকে উঠে আসা বিস্ময় প্রশ্নের সীমানায় এসে পৌঁছয়, পরিচালক এমনটা ভাবলেন কী করে? এমনও ছবি হয়? এভাবেও ছবি করা যায়? ‘ইন্টারভিউ’ সেই ধরনেরই একটা ছবি। অসাধারণ একটা ফার্স। অনন্য তার ফর্ম। বাংলা সিনেমায় এই ফর্মটাই এর আগে ছিল না। তথ্যচিত্র-সিনেমা-বাস্তব চরিত্র-ইন্টার্যাকশন সব মিলিয়ে গল্প বলার ধরণটাই বদলে দিয়েছে এই ছবিটা। ফ্রান্সের নিউ ওয়েভ সিনেমার ধারা প্রথম বাংলা সিনেমায় উদ্দাম ভাবে কেউ যদি নিয়ে এসে থাকেন, তবে তিনি মৃণাল সেন। একমাত্র তিনিই প্রতিবাদী প্রোটাগনিস্টের হাতে ইট ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ইংরেজ চলে যাওয়ার পরও সাহেবিয়ানার ভুত রয়ে গেছে বাঙালির মজ্জায়-অফিসে-আদালতে-শিক্ষায়-মধ্যবিত্তের স্বপ্নে। ছবিতে রঞ্জিত মল্লিক পাথর ছুঁড়ে শো-কেস ভেঙে ম্যানিকুইনটার সাহেবী পোশাক ফালা ফালা করে ছিঁড়ে তাকে নাঙ্গা করে তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছেন, রাগ মিটিয়েছেন, মধ্যবিত্ত স্বপ্নের মিথ্যে মায়াজাল ছিঁড়তে চেয়েছেন। মার্কসদীক্ষিত মৃণাল বুঝিয়ে দেন যুগে যুগে এই বঞ্চিত লোকেরাই বিপ্লব ঘটায়। প্রতিবাদের এই ভঙ্গিটাই বঙ্গবাসী পাশ্চাত্যমুখী সেই দুই মহিলা দর্শকের হজম হয়নি। এর জন্যই ছবিটা তাঁদের কাছে ‘অ্যান্টি-সোশ্যাল’।
‘একদিন প্রতিদিন’-ছবিতে ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাড়ির একমাত্র চাকরিজীবী মেয়ে সারারাত বাড়ি ফেরে না। একেবারে ভোর বেলায় ফেরে। বাড়ির সকলের টেনশন, তার জন্য অপেক্ষা, অপেক্ষার পরতে পরতে বেরিয়ে আসে প্রত্যেকের স্বার্থপরতা, খুলে যায় দিন যাপনে প্রয়োজনের মুখোশ। ছবিটায় শেষ অব্দি স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই মেয়েটি সারারাত কোথায় ছিল। মধ্যবিত্ত জীবনে সুস্থভাবে বাড়ি ফেরাটা বড় কথা নয়, বড় কথা একা একটা মেয়ে সারারাত কোথায় ছিল সেটা জানা! তাই ছবিটা দেখে এক মহিলা একবার মৃণাল সেনকে প্রশ্নও করেছিলেন, ‘আচ্ছা, মেয়েটা সারারাত কোথায় ছিল?’ মৃণাল সেন পাল্টা প্রশ্নে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি জানি না, আপনি কি জানেন?’
শোনা যায় মৃণাল সেনের প্রথম দিকের ‘পুনশ্চ’, ‘রাত ভোরে’, ‘অবশেষে’, ‘প্রতিনিধি’ প্রভৃতি কয়েকটি ছবি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, আর প্রিন্ট পাওয়া যায় না। নিজের ছবি নষ্ট হলেও তিনি ‘আকালের সন্ধানে’ ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া বাংলা নির্বাক ছবি ‘জামাইবাবু’-র প্রিন্ট উদ্ধার করেছিলেন। ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে এক রাজবাড়ির পরিত্যক্ত অংশে ফিল্মের খান দুয়েক ক্যান পড়ে থাকতে দেখতে পান। সেই ক্যান দুটো উদ্ধার করে বুঝতে পারেন এটি নির্বাক যুগের ছায়াছবি ‘জামাইবাবু’র প্রিন্ট। ‘কৃষ্ণকীর্তন’-এর পুঁথি যেমন গোয়ালঘরের মাচা থেকে আবিষ্কার করা হয়েছিল, এও যেন তেমনি। এ-দেশে নির্বাক যুগের হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমার প্রিন্ট পাওয়া যায়, তার মধ্যে ‘জামাইবাবু’ একটি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news