Home / TRENDING / প্রিয়দা বলতেন কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ নেই! জেনে নিন আপাত-অবিশ্বাস্য কথা বলতেন কেন?

প্রিয়দা বলতেন কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ নেই! জেনে নিন আপাত-অবিশ্বাস্য কথা বলতেন কেন?

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ কলাম 

আক্ষরিক অর্থেই সাত সকাল। সাতটা পাঁচ/দশ হবে। চায়ের কাপ আর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছি। বেজে উঠল মোবাইল। নীল এলসিডির গায়ে ভেসে উঠল নাম। প্রিয়দা।
‘দাদা বলুন!’
‘হ্যাঁরে আমার ইন্টারভিউটা চালিয়েছিস?’
‘কী বলছেন দাদা! আপনার ইন্টারভিউ চালাব না তাও কী হয়!’
‘ওদিকের খবর কিছু পেলি? ‘
ওদিকের! একটু ভাবলাম। পরক্ষণেই বুঝতে পেরে হেসে বললাম, ‘আপনার বোন তো সারারাত কাজ করেন। ভোরের দিকে ঘুমোতে যান। উনি তো এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি।’
‘তাহলে জানতে পারলে আমায় বলিস!’
হেসে বললাম, ঠিকাছে দাদা। অবশ্যই বলব।


আসলে তার আগের দিনই আমায় একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রিয়দা। সময়টা ২০০৮। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জোট প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে তখনও খুব সোচ্চারে নয়। ভেতর ভেতর। একজন অকিঞ্চিতকর সাংবাদিককে ফোন করে প্রিয়দা জানতে চাইছেন ওদিকের খবর কী! মানে সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছেন তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া কী! ২০১১-র দিকে তাকিয়ে ২০০৮ থেকেই জোট চেয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন। চেয়েছিলেন ২০০৮-এর পঞ্চায়েতেই ঘোষিত ভাবে জোট হোক দুই দলের। শেষ পর্যন্ত হয়নি। কংগ্রেসের উদ্দেশ্য নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভবত সংশয় ছিল। এই ব্যাপারে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা সুখের ছিল না। ২০০৭ থেকেই সনিয়া গান্ধি সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে বামেদের আর ছেড়ে খেলা হবে না। ১৯০৮-এ রবীন্দ্রনাথ কংগ্রেসের প্রাদেশিক সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন। ঠিক একশ বছর পরে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত, বলা যায় রবীন্দ্রমুগ্ধ এক রাজনীতিক আরও একবার প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির আসনে বসলেন। রাজ্যে পালা বদলের লক্ষ্য নিয়ে।

২০০৮-এর পঞ্চায়েতে জোট (আসন সমঝোতা) হয়নি ঠিকই কিন্তু যা হয়েছিল সেটা একেবারেই প্রিয়দা স্পেশাল! প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে সাংবাদিক বৈঠকে প্রিয়দা বললেন, যেখানে কংগ্রেসের প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা একেবারেই নেই সেখানে কংগ্রেসের সমর্থকরা যেন তৃণমূলকে ভোট দেন।
জোট নিয়ে এতটাই আন্তরিক ছিলেন প্রিয়রঞ্জন।
শুনলে একটি বালকও হাসবে তবু সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে প্রিয়দা বললেন, কংগ্রেসে কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ নেই। বললাম, দুনিয়ার কেউ বিশ্বাস করবে একথা! আপনার আর সোমেনদার গোষ্ঠীদ্বন্দ তো কংগ্রেসে প্রবাদপ্রতিম ব্যাপার! আবার নির্বিকার চিত্তে বললেন, কংগ্রেসে কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ নেই। চুপ করে তাকিয়ে রইলাম ওঁর দিকে। এরপরেই তাঁর অমোঘ উক্তি, ‘যখন আসল লড়াই থাকে না তখন নিজেদের মধ্যের লড়াই বড় হয়ে ওঠে। আসল লড়াই যেই শুরু হবে অমনি নিজেদের লড়াই হাওয়া হয়ে যাবে।’
প্রিয়দা সভাপতি হওয়ার পর থেকে সোমেনদা বিধান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অফিসেই বসতেন। বিধানভবনের টপ ফ্লোরে। প্রিয়দা একদিন মিডিয়া কমিটি তৈরি করলেন। নির্বেদ রায়, অরুণাভ ঘোষেদের নিয়ে। বলে দিলেন, এরা ছাড়া আর কেউ মিডিয়ার সামনে মুখ খুলবে না। অতি উৎসাহী একজন জিজ্ঞাসা করে বসল, দাদা সোমেনদাও কি তাহলে মিডিয়াকে কিছু বলবেন না? আর যায় কোথায়! প্রিয়দা বললেন, কী! সোমেন এর মধ্যে আসে কোথা থেকে! আমিও তো মিডিয়া কমিটিতে নেই। তাহলে কী আমিও মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবনা! আমি ঠিক যে কারণে বলব, সোমেন ঠিক সেই কারণেই বলবে।
প্রিয়দা নাকি কথা রাখতেন না! কথা দিয়ে কথা না রাখার, যা বললেন ঠিক তার উল্টোটা করার হাজারো গল্প ঘুরে বেড়ায় কংগ্রেস-তৃণমূলের মজলিশি আড্ডায়। যাঁর কথা না রাখার এত গল্প তিনি আমায় কথা দিয়েছেন আমাদের চ্যানেলে আসবেন! সকাল থেকে চ্যানেল মালিক জিজ্ঞাসা করছেন, ‘কিরে আসবেন তো!’ জেনারেল ম্যানেজারের প্রশ্ন, ‘কি সিওর তো?’ প্যান্ট্রিতে কাজ করত রাজু, সেও বলে, ‘দেবকদা, উনি সত্যি আসবেন!’ সকলের প্রশ্নে আমি তখন কনফিডেন্স লুজ্ করছি! সন্ধেবেলা আসার কথা আমি বিকেল তিনটে থেকে গিয়ে বসে রইলাম বিধানভবনে, সভাপতির ঘরে। যাকে বলে সিলি পয়েন্টে ফিল্ডিং! ক্যাচ ফসকালে চলবে না। হাজারো গল্প, তারই মধ্যে দরকারি কাজ, জরুরী ফোন ইত্যাদি করে ৬ টার সময় উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, চল। আমায় ছাড়া আর কাউকে লিফটে উঠতে দিলেন না। লিফট নামতে শুরু করতেই বললেন, ‘আমি এখন একটা ডাক্তারের কাছে যাব বুঝলি? সেখান থেকে তোর ওখানে যাব।’ আমি বুঝলাম, এ সুর ভাল নয়। নিচে নেমে গাড়িতে উঠলেন একা। চালক আর প্রিয়দা। বেণুদা জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদা কোথায় যাচ্ছেন?’
বললেন, ‘জাহান্নমে যাচ্ছি!’
প্রিয়দার গাড়ি ফলো করার জন্যে নিজের গাড়ি খুঁজতে ছুটে গেটের বাইরে এলাম। কোথায় গাড়ি! প্রিয়দার গাড়ি বেরোবে বলে গেটের সামনে থেকে সব গাড়ি সরিয়ে দিয়েছে সিকিওরিটি।
খানিক পর থেকে ফোন করা শুরু করলাম। শুধু রিং হয়ে যায়। ফোন যখন ধরলেন তখন ৮টা। বললেন, আজ আর হল নারে! শণিবার করে দেব। বললাম, শণিবার তো আপনার বোন বনধ ডেকেছেন। বললেন, শণিবার বা সোমবার কেউ বনধ ডাকলে বনধ বলবি না। বলবি টানা ছুটি! তবে তোকে কথা দিচ্ছি তোকে আমি ইন্টারভিউ দেবই।
কথা রেখেছিলেন প্রিয়দা। একদিন দুপুরে ডেকে নিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে। বাংলায় সম্ভবত সেটাই ছিল প্রিয়রঞ্জনের শেষ টিভি সাক্ষাৎকার।
তারপর? তারপর রাজনীতি, খেলা, মন্ত্রীত্বর আড়ালে থাকা নিভৃত মুখর কবিটি নীরব হয়ে গেলেন।
ভাল থাকবেন প্রিয়দা!

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

আপনারা সরকারের মুখ বলে আধিকারিক দের বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর।

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্ক: রাজ্যের আমলাদের উজাড় করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার প্রথমে নতুন করে সংস্কার হওয়া …

WBCS দের সভা থেকে কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্ক: WBCS দের সঙ্গে বৈঠক, আর সেখান থেকেই করা বার্তা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের। …

বন্ধ ব্যান্ডেল জংশন

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্কঃ রুট রিলে ইন্টারলকিং কেবিন স্থানান্তর ও থার্ড লাইন সম্প্রসারণের জন্য হাওড়া-বর্ধমান মেইন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *