Home / TRENDING / কলেজ স্কোয়্যারের কণ্ঠরোধ

কলেজ স্কোয়্যারের কণ্ঠরোধ

নীল বণিক :

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা সিদ্ধান্তই ইতিমধ্যে বইপাড়ায় রাজনৈতিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চলেছে। কিংবা বলা ভাল করে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে,  কোনও কোনও রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির জায়গা বদল করছে কলেজ স্কোয়্যারের পরিবর্তে অন্য কোনও স্থানে। কলেজ স্ট্রিট চত্বরের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। যা আমাদের রাজ্যের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে একটি মাইল ফলক। কলেজ স্কোয়্যারে রাজনৈতিক আন্দোলন হঠাৎ করে মুখ্যমন্ত্রী কেন বন্ধ করতে গেলেন তা রাজনৈতিক মহলের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি, কলেজ স্ট্রিটে আন্দোলনের জেরে ক্ষতি হচ্ছে পড়াশোনার। তবে মুখ্যমন্ত্রী এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখতে পারতেন! ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামের গণহত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার জন্য সেদিনও বুদ্ধিজীবীরা কলেজ স্কোয়্যারকেই বেছে নিয়েছিলেন। কলেজ স্কোয়্যারে একসঙ্গে এতজন বুদ্ধিজীবীদের পথে নামতে দেখে সারা বাংলার মানুষ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিবাদ আজও মনে করলে শিহরন জাগে মনে। হালফিলের কথা বাদই দিলাম সত্তরের দশকে কলেজ স্কোয়্যারের বই পাড়ার আন্দোলনের কথা রাজ্যবাসী ভুলবেন কীভাবে। যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রেসিডেন্সির পড়ুয়াদের আন্দোলন। যদিও প্রেসিডেন্সির পড়ুয়ারা সেই সময়ে বাম আন্দোলকে কেন্দ্র করে দু’দিকে বিভক্ত ছিলেন। নকশাল বাড়ির আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে নকশাল বাড়ি কৃষক সংগ্রাম সমিতি নামে একটি মঞ্চ তৈরি করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বইপাড়ার বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। নকশাল নেতা অসীম চ্যাটার্জি, আজিজুল হকদের কলেজ স্কোয়্যারের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাকে আজও অনুপ্রাণিত করে বাম রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাম ছাত্র ও যুব নেতাদের । অন্যদিকে বইপাড়া এর-ও সাক্ষী থেকেছে উগ্রবামপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে একদল যুবকদের আন্দোলন। আজকের এসএফআই সেই সময়ে ছিল এসএফ। সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফের পতাকা নিয়ে উগ্র বামপন্থার বিরুদ্ধে ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছিলেন বিমান বসু সুভাষ চক্রবর্তীর মতো লিডাররা। এই সময়ে কলেজ স্কোয়্যারের আন্দোলনের অন্য আরেক মুখ ছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়। সেই সময়ে ছাত্র পরিষদের অফিস ছিল মহাজাতি সদন। তারাও আন্দোলন করতে সেই সময়ে নেমে আসতেন কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায়। ৭০ দশকেও কলেজ স্ট্রিটের স্কুল-কলেজগুলিতে পড়াশোনার যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। ৭২-এর সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের জমানাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি আর নকশাল নিধন যজ্ঞে সত্যিই হিন্দু হেয়ার সহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের লেখাপড়াতে যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। তা একেবারেই অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আজকেরদিনে দাঁড়িয়ে সেই রাজনৈতিক উত্তাপ অনেকটাই ফিকে বই পাড়ার আন্দোলনে। এতো গেল ৭০ দশকের কথা। নৌ-বিদ্রোহের সময় রসিদ আলি দিবসে কলেজ স্কোয়্যারের সেই মিছিল। স্বদেশি আন্দোলনের সময় শহিদ রসিদ আলির শ্রদ্ধায় কলেজ স্কোয়্যারে আরএসপির সেই মিছিলে তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত ছিল না। নৌ বিদ্রোহ তো বটেই আজাদ হিন্দ বাহিনীর তিন পদস্থ অফিসারের বিচারের ব্যবস্থা করেছিল ইংরেজ শাসক। এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল সারা দেশ। গর্জে উঠেছিল কলকাতা। এই আইএনএ বন্দিমুক্তি আন্দোলনের বিশাল মিটিং হয়েছিল কলেজ স্কোয়্যারে ২৯ অগস্ট ১৯৪৫। আবার তিন মাস পর মিটিং হয়। দিনটা ১৭ নভেম্বর। কলেজ স্কোয়্যারের সেই মিটিংয়ে সভাপতি ছিলেন বীরেন ভট্টাচার্য। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন তারা দাস, অনিল রায়। কংগ্রেস যে আইএনএ ডিফেন্স কমিটি তৈরি  করেছিল ওই কমিটির তহবিলের জন্য উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানানো হয়। সকলেই কমবেশি দান করেছিলেন ওই তহবিলে।

যার রাজনৈতিক ইতিহাসের এতো গরিমা তার কাছ থেকেই এই অধিকার কেড়ে নিয়ে ঠিক করলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়? সেই প্রশ্নের জবাব সময় বলবে। তবে কলেজ স্ট্রিট চত্বরের কোলাহলে বন্ধ হয় পড়াশোনা। মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগের পর আদৌ শিক্ষার হাল কি ফিরবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রেসিডেন্সিতে। তারই অপেক্ষায় এখন রাজ্যবাসী।

 

 

Spread the love

Check Also

কেমন হলো, মুখ্যমন্ত্রীর এপিসোডের প্রথম ঝলক ?

সুচরিতা সেন, বিনোদন ডেস্ক রোজ বিকেলে বাংলার প্রতিটি ঘরে বিনোদন শুরু হয় এই শো এর …

বছর শুরুতে শিব দরবারে মিমি

চ্যানেল হিন্দুস্তান, বিনোদন ডেক্স বর্তমানে বেনারস ভ্রমণে ব্যস্ত টলিউড নায়িকা। সেখানকার অলি-গলিতে ঘুরছেন। সদ্য ওটিটি …

রশিদ খানের ফিরে দেখা জীবনধ্যায়

বিনোদন ডেস্ক, সুচরিতা সেন, আবার নক্ষত্রপতন, না ফেরার দেশে চলে গেলেন ওস্তাদ রশিদ খান। গানের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *