Breaking News
Home / TRENDING / বিমান বসুর ৮০ : নীলরতন বলেছিলেন শিশুর জন্মে সমস্যা হবে, বিধানচন্দ্র দিয়েছিলেন ভরসা

বিমান বসুর ৮০ : নীলরতন বলেছিলেন শিশুর জন্মে সমস্যা হবে, বিধানচন্দ্র দিয়েছিলেন ভরসা

জয়ন্ত চৌধুরী


বিমানদার জন্ম নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বাচ্চা জন্মাবে নাকি স্টিল বর্ন হবে, এমনই কিছু একটা সমস্যা হয়েছিল। চিকিৎসক নীলরতন সরকার বিমানদার মাকে দেখে এমনই কথা বলেছিলেন। বিমান বসুর বাবা নিজেও ছিলেন চিকিৎসক, তিনি বিধানচন্দ্র রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের মধ্যে ছিলেন। বিধানচন্দ্র রায় (Bidhanchandra Roy) বিমানদার মাকে দেখে বলেছিলেন সব ঠিকই আছে। তারপর নর্মাল ভাবেই বিমানদার জন্ম হয়। এসব কথা আমাদের বিমানদার মুখেই শোনা।

অত্যন্ত সচ্ছল ও বড়লোক পরিবারের ছেলে ছিলেন বিমান বসু (Bimal Bose)। কিন্তু এক কাপড়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন অল্প বয়সে। যখন তিনি বাড়ি ছাড়েন, তাঁর পকেটে একটা পয়সাও ছিল না। বাবা আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন, মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন বিমান দা। পার্টির হোল টাইমার তখন, সেই সময় মাঝে মধ্যে দুপুরে বাড়ি গিয়ে মায়ের সঙ্গে খাওয়া দাওয়াও করতেন। বিমান যাবেন তা আগেই মাকে জানানো থাকত। ফলে ছেলের জন্য দুপুরের খাবার করে রাখতেন মা। হয়তো দুজনেই একসঙ্গে বসে খেতেন। যে ঘটনার কথা বলছি, তা ১৯৮৪ সালের। সেবার লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর থেকে সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় (Somnath Chatterjee) হেরে গিয়েছেন। ১৯৮৪ সালের লোকসভা ভোটে আসনের নিরিখে ভরাডুবি হয়েছিল বামফ্রন্টের। বিমানদাদের বাড়ি বালিগঞ্জে, তখন তা যাদবপুর লোকসভার অধীন। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতার হেরে যাওয়ায় মন খারাপ ছিল বিমান বসুর।

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিমান বসুর পারিবারিক বন্ধু। সেই সূত্রে তাঁর মায়ের সঙ্গে ভালই পরিচয় ছিল সোমনাথের। বাড়িতে গিয়ে মুখ ভার করে বসেছিলেন বিমান। বিমানদার বয়ানে বলছি, “মা দেখি এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছেন আমার সামনে এসে বসছেন না কিছুতেই। আমি যেন এসব দেখে অন্য কিছুর একটা গন্ধ পাচ্ছি। আমি বাড়িতে না থাকলেও মায়ের আচরণটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না।” বিমানদা মাকে বলেছিলেন, “জানি মা তোমার মন খারাপ সোমনাথ দা হেরে গিয়েছেন। কেন যে হেরে গেল কি করে যে হেরে গেল সোমনাথ দার মতন লোক?”


হঠাৎ নাকি বিমানদার মা রিয়্যাক্ট করেন। বলে ওঠেন, “হারবেই তো, আমিও তো ভোট দেইনি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে।” মায়ের মুখে এমন কথা শুনে বিমান বলে ওঠেন, “মানে?” এরপর মা জোর দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ দিইনি তো।” ওই সময় সঞ্জীব-তীর্থঙ্কর নামে দুই যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ব্যারাকপুরে। সেই সময় ওই দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশ হৈচৈ হয়েছিল। সেই সময় সঞ্জীব-তীর্থঙ্কর-এর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের হয়ে মামলা লড়েছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। দাবি করা হয়েছিল, ওই যুবককে খুন করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় লড়াই করেছিলেন ওই দুই যুবক খুন হননি বলে।


বিষয়টা নিয়ে এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল যা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। অথচ সোমনাথবাবু কিন্তু এই মামলাটি লড়েছিলেন সম্পূর্ণ পেশাদারী তাগিদে। সেই সময় সিপিএম পার্টির সম্পাদক ছিলেন সরোজ মুখোপাধ্যায়। তিনি ওই জোড়া মৃত্যু প্রসঙ্গে এমন একটি মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জোর বির্তকের সৃষ্টি হয়েছিল। যা শহর কলকাতার মানুষের মনে সেই সময় প্রভাব ফেলেছিল। সেই মন্তব্যগুলি যে বিমানদার মাকেও প্রভাবিত করেছিল, এবং মায়ের অন্তরে আঘাত করেছিল। তা সেদিনই তিনি বুঝতে পারেন। সেই ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ঘরের ছেলে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে ভোট দেননি। সম্ভবত তিনি ভোট দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বলে ধরে নিতে হবে। বিমানদা আমাদের বলেছিলেন, “সেই সময় আমি আর খাব কি মায়ের কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম।”


২০০৭ সালে বিমান বসুর মুখে শুনেছিলাম এই কথাগুলো। ২০০৭ সালে যখন সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ঘটনা নিয়ে রাজ্য উত্তাল। সেই সময় মহাকরণের করিডোর দিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (Buddhadeb Bhattacharya) বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় আমরা অনেক সাংবাদিকরা একসঙ্গে তাঁকে কিছু একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করি। তিনি তখন রেগে গিয়ে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন,”আপনারা কিভাবে কাগজ চালান আমিও দেখে নেবো।” এই রকমই কিছু একটা হুমকি দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। সেই ঘটনা নিয়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। আমি তখন প্রেসক্লাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি। প্রেসক্লাবে তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি সহ বেশ কিছু আধিকারিক মিলে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে দেখা করবে। দেখা করাও হয়েছিল।

সেই তালিকায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে বিমান বসু যেমন ছিলেন। তেমনি ছিলেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Mamata Banerjee)। আমরা বলেছিলাম, এই যে রাজনৈতিক নেতারা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন। তাতে আমরা পাবলিকলি বহু জায়গায় হেকেলড হয়ে পড়ছি। সিপিএমের লোকেরা হেকেলড করছে, কোথাও আবার তৃণমূল। সেই সময় মমতার মিটিংয়েও সাংবাদিকরা হেনস্থা হয়েছেন। একাধিক জায়গায় মার খেয়েছেন। আমরা প্রত্যেকের কাছে গিয়ে বলেছিলাম আপনারা একটু সহিষ্ণু হোন। সত্যি কথা বলতে কি আমরা ক্ষোভই জানিয়েছিলাম।

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমরা গিয়েছিলাম বিমান বসুর কাছে। প্রেসক্লাবে যে ডেলিগেসন তার কাছে গিয়েছিল তাতে আমিও ছিলাম। তিনি সেই সময় স্বীকার করেছিলেন, আমরা অনেক সাংবাদিককে অনেক কথাই বলি। তবে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সঙ্গে আমরা যেভাবে কথা বলি। নবীন সাংবাদিকদের সঙ্গে আমরা সেভাবে কথা বলি না। এখন অনেক সাংবাদিক আসছেন যারা প্রথম দিনে এসেই অনেক প্রশ্ন করেন অথচ অগ্র-পশ্চাৎ জানেন না। তিনি বলেছিলেন, নেতাদের কথায় প্রভাবিত হয়েই কর্মীরা অনেক সময় সাংবাদিকদের নিগৃহীত করে ফেলেন। সেই সময় বিমান দা বলেছিলেন, আমি আমার নাতনির বয়সী এক সাংবাদিককে খুব কটু কথা শুনিয়ে ছিলাম। আমি অনুতপ্ত হয়ে তাকে ফোনও করেছিলাম। সেই সময়ই মায়ের ঘটনাটা আমাদের বলেছিলেন বিমান দা।

Spread the love

Check Also

আইপিএল থেকে সরানো হল ভিভোকে, বিবৃতি দিয়ে জানাল বিসিসিআই

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের বিজ্ঞাপন থেকে বাদ দেওয়া হল চিনের মোবাইল …

৪০ বছর পর পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হল লন্ডনের ঐতিহাসিক উইন্ডসোর দুর্গ

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ৪০ বছরের বেশি সময় পরে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে ব্রিটেনের উইন্ডসোর …

করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হল সিপিএম নেতা শ্যামল চক্রবর্তীর

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণ হারালেন আরও এক নেতা। এবার প্রয়াত হলেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!