Breaking News
Home / TRENDING / পাঁচুর প্যাঁচালে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়

পাঁচুর প্যাঁচালে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়

পার্থসারথি পাণ্ডা:

 

পাঁচু, মানে পাঁচুগোপাল চক্রবর্তী না থাকলে আমরা শিক্ষক বিভূতিভূষণকে পেতাম, কিন্তু সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেতাম না। বিএ পাশ করার পর স্কুল মাস্টারি পেয়ে ডায়মন্ডহারবারের এক গ্রামে গিয়ে তাঁর আলাপ হয়েছিল পাঁচুর সঙ্গে। পাঁচু কবি মানুষ, বয়সে সদ্য যুবক। গ্রামের এক পত্রিকায় তার কবিতা বেরিয়ে গেছে ততদিনে। ‘বালক কবি’ উপাধিও সে আদায় করে নিয়েছে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে। এসব বেশ অবাক করেছিল বিভূতিকে। রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে পোস্টমাস্টার যেমন নিঃসঙ্গ পল্লী প্রবাসে ছোট্ট রতনকে যেমন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন, বিভূতিভূষণ তেমন করে পেয়েছিলেন পাঁচুকে। ছেলেটির মধ্যে সাহিত্যবোধ আর নিসর্গের প্রতি বিস্ময়বোধ ছিল, এটাই তাঁকে টেনেছিল, ছেলেটিকে বন্ধু করে নিতে বাধ্য করলো। আবার এই পাঁচুই প্যাঁচাল পাকিয়ে বিভূতিভূষণকে সাহিত্যিক হতে বাধ্য করলো। সে এক গল্প।

 

গত শতকের দুইয়ের দশক। কলকাতা থেকে ছ’আনায় একটি বই–সিরিজে প্রতি মাসে বই বেরুতে শুরু করেছে। সবই হয় উপন্যাস, নয় গল্পের বই। পাঁচুর খুব ইচ্ছে সেও এরকম বই বার করবে, এক টাকায় একটা গ্রন্থাবলী। আর এই ব্যবসায় পার্টনার হতে হবে বিভূতিভূষণকে। ছোকরার ভাবনার ছিরি দেখে বিভূতি পড়েন আকাশ থেকে। বই ব্যবসার তিনি কিছু জানেন নাকি! আর তাছাড়া লেখককে তো পারিশ্রমিক দিতে হবে, সে আসবে কোত্থেকে? বই ছাপালেই তো হবে না, বিক্রিও তো করতে হবে। গন্ডগাঁয়ে বসে সে আবার হয় নাকি! কিনবে কে?  টাকার সমস্যাটার একটা সমাধান পাঁচুর হাতের কাছেই আছে– বইগুলো যদি পালা করে পাঁচু আর বিভূতিভূষণ লেখেন তাহলে তো আর লেখককে টাকা দেবার কথা ভাবতে হয় না। যদিও পাঁচু কবি, গল্প সে লেখেনা, তবু চেষ্টা করলে কি আর খান কয়েক লিখতে পারবে না? খুব পারবে। আর বিভূতিভূষণ বিএ পাশ লোক, তাঁর অন্তত লিখতে পারা উচিত। বিভূতিভূষণ ভেবে পান না বিএ পাশের সঙ্গে সাহিত্য রচনার আবশ্যিক শর্ত কোথায়? যাঁরা বিএ পাশ করেন তাঁরা সকলেই কি সাহিত্যিক? যাক গে, তাঁর স্নেহের পাঁচুর এই টোটাল ভাবনাটিকে ছেলেমানুষী ভাবনার কোটায় ফেলে ক্ষমাঘেন্না করে বিভূতি বেমালুম ভুলে গেলেন। কিন্তু ভবীর মতোই পাঁচু ভুলল না।

 

এরই মধ্যে উৎসাহের চোটে পাঁচু একদিন করলো কি, স্টেশনের কাছে সস্তার এক ছাপাখানায় বেশ কিছু হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে গাঁয়ের সর্বত্র তো বটেই, এমনকি বিভূতিভূষণের স্কুলের দেওয়াল থেকে শুরু করে গাছের গা অব্দি বাদ গেল না। তাতে কি লেখা জানেন? তাতে লেখা, এক নতুন বইয়ের রোমহর্ষক বিজ্ঞাপন, বইয়ের লেখক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। সেদিন স্কুলে যাবার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েই তাঁর চক্ষুস্থির। বুঝলেন এ কম্ম পাঁচুর ছাড়া আর কারুর না। ব্যাটা করেছে কি! মানসম্মান সব ডোবাল দেখছি! গাঁয়ের  ছেলেবুড়ো থেকে স্কুলের সহশিক্ষক ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে এদিন থেকেই জ্বালিয়ে মারতে শুরু করলো, কবে বেরুবে আপনার বই মাস্টারমশাই? বেরুলে আমাদের পড়তে দিতে হবে কিন্তু! ছাপার আগেই একদিন পড়ে শোনান না! মুখোমুখি হলেই এক প্রশ্ন, এক আব্দার। লেখা কোথায়, যে ছাপা হবে? বিভূতিভূষণ গিলোতেও পারেন না, ওগরাতেও পারেন না। বলতে পারেন না, প্যাঁচালটা পাকিয়েছে পাঁচু, তাঁর কোন দায় নেই। হাঁপিয়ে উঠে পাঁচুকে চেপে ধরলেন, করেছিস কি! পাঁচু নিষ্পাপ হেসে বলে, কেন, সেদিন কথা হয়ে গেল যে? আপনি আমি লিখব আমরা ছাপাবো। আমি তো কবি, আমার তো গল্পটল্প তেমন আসে না, তাই আমার ইচ্ছে, প্রথম বইটা আপনিই লিখবেন। সেজন্যই বিজ্ঞাপন দিয়েছি। আগে থেকে বিজ্ঞাপন না দিলে চলে! বিক্রি করতে হবে না? এইরকম একটা সরল স্বীকারোক্তির ওপর আর কিছু বলা যায় না।

 

পাঁচু নিজের অজান্তেই যে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, তা থেকে বাঁচতে হলে এখন বিভূতিভূষণের একটাই পথ খাতায় একটা কিছুমিছু লিখে ফেলা। বই ছাপা পাঁচুর দুরাশা, সে তিনি ভালোই জানেন। লোককে অন্তত খাতাটা দেখিয়ে বলতে পারবেন, এই দেখ ভাই লেখা, ছাপা না হলে আমি কি করবো! সেই রোখ চাপল লেখার। কিন্তু কি লিখবেন? কলেজ ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ কবিতা লিখেছেন বটে, কিন্তু সে আর এ তো এক নয়। কোনদিন তো ভাবেননি যে, সাহিত্যের জন্য কলম ধরবেন। এখন উপায়? কয়েক রাত ঘুম হলো, দিনেও শান্তি নেই। প্লট ভাঁজার অভ্যেস নেই, তাই কিছুতেই স্থির করতে পারেন না, কি লিখবেন, কাকে নিয়ে লিখবেন। এই অবস্থায় একদিন ভেসে এলো একটা মুখ। নারী। এক অতৃপ্ত মাতৃময়ী নারী। স্কুলে যাবার পথে তাঁকে প্রায়ই দেখেন হয় পুকুর থেকে কলসি কাঁখে জল আনতে। কথা হয় না, কিন্তু তাঁর চোখে অনেক কথা পড়া যায়। সেই নারীকে নিয়েই লিখলেন প্রথম গল্প, ‘উপরক্ষিতা’। 

 

গল্পটা লিখে নিজেরই মনে হল, মন্দ হয়নি। কিন্তু প্রথম লেখার ওপর তেমন ভরসা হয় না তাঁর। চাই বন্ধুদের মতামত। শুনে কেউ বলল, ভালো। কেউ বলল, মন্দ নয়। অন্তত খারাপ কেউ বলল না। তখন পাঁচুর মতো মনে  বাসনা হল ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার, মনে হল, দেখাই যাক না কোন পত্রিকায় দিয়ে, ছাপে কি না। পত্রিকা ছাপল। ব্যস, সেই যে শুরু হল, বিভূতিভূষণের লেখনী আর থামেনি। ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’, ‘অপরাজিত’-র মতো অনবদ্য সাহিত্য উপহার দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। দিয়েছেন মগ্ন প্রকৃতিময় এক নতুন পথের সন্ধান। পাঁচুগোপাল চক্রবর্তী নিজেকে কবি হিসেবে হয়তো প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি কোনদিন, কিন্তু বিভূতিভূষণকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন প্রতিষ্ঠার পথে। আর সেটাই যেন ছিল বাংলা সাহিত্যের ভবিতব্য।

Spread the love

Check Also

নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একটি ভারতীয় ভাষা সকলের শেখা উচিত : রাজনাথ

নিজস্ব প্রতিনিধি। মহাদেব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। দেশের প্রতিটি কোনায় তাঁর মন্দির এক এবং অখণ্ড ভারতের …

শোভনের পাল্টা ববিদাকে চাই হোডিং কলকাতায়

নিজস্ব প্রতিনিধি। শোভনের পাল্টা ববি ! শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে একটি হোডিং চোখে পড়ে। যেখানে …

পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? জল্পনা কংগ্রেসে

নিজস্ব প্রতিনিধি। পশ্চিমবঙ্গ থেকেই কী রাজ্যসভায় যাবেন প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? তেমনি জল্পনা উস্কে দিয়ে গেলেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *