Breaking News
Home / TRENDING / অমরকণ্ঠী অমর পাল

অমরকণ্ঠী অমর পাল

তরুণ সেন

বাংলা ছায়াছবিতে প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী অমর পালের গাওয়া গানের কথা উঠলে যে গানটি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঠোঁটে উঠে আসে, সেটি সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ (১৯৮০) ছবির ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’। সত্যজিতের লেখা ও সুর দেওয়া এই গানটি ছিল চারণ চরণদাসের লিপে। গানটি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, প্রতিটি জলসায় শ্রোতার দাবিতে শিল্পীর এই গান না গেয়ে নিস্তার ছিল না এবং শিল্পীর আত্মার সঙ্গে এই গান এমনভাবে জুড়ে ছিল যে, তাঁরও এ গান না গেয়ে তৃপ্তি ছিল না। মানুষ হিসেবে, একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে, একজন লোকসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন বিস্তৃত বটগাছের মতো; যাঁর ভিতরে বাইরে ছায়াসুন্দর সবুজে সবুজ, যাঁর কণ্ঠে কখনই বয়সের ভার জমেনি।

বাংলা ছায়াছবিতে প্লেব্যাকশিল্পী হিসেবে বা লোকসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ কিন্তু ‘হীরক রাজার দেশে’ নয়। তারও প্রায় দু’দশক আগে। আর এক বিখ্যাত পরিচালক দেবকী কুমার বসু’র ছবি ‘চাষী’-তে লোকগান ‘ধান কাটি, কাটি ধান’ গানটি গাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছিল। এই ছবির নায়ক ও নায়িকা ছিলেন সেই সময়ের বাংলা নাট্যজগতের দুই কিংবদন্তী শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র। দেবকীবাবু অমর পালকে তাঁর কণ্ঠের জন্য গায়কীর জন্য অত্যন্ত স্নেহ করতেন, খুব ভালোবাসতেন। তাই এই পছন্দের মানুষটিকে তিনি শুধু গান গাইয়েই তৃপ্ত হতে পারেননি, তাঁকে দিয়ে অভিনয়ও করিয়েছেন। ছয়ের দশকের শুরুতে ‘সাগর সঙ্গম’ ছবিতে। কালাচাঁদ বাউলের চরিত্রে। স্বভাবতই অমরবাবু গানও গেয়েছিলেন এই ছবিতে, রাইচাঁদ বড়ালের সুরে। তিনি যে শুধু দেবকী কুমারের স্নেহধন্য ও প্রিয় ছিলেন, তাই নয়; বিখ্যাত পরিচালক তপন সিনহা ও অরুন্ধতী দেবীরও খুব প্রিয় ছিলেন। তপনবাবুর বাড়িতে বসত তাঁদের নিয়মিত বৈঠকী আড্ডা। তপনবাবু ও অরুন্ধতীদেবী–দুজনেই সঙ্গীতরসিক মানুষ, ফলে তাঁদের সঙ্গে অমরবাবু আড্ডায় বসলে তা যে পদে পদে সংগীতমুখর হয়ে উঠবে, তাতে আর বিচিত্র কি। ১৯৬৯ সালে অরুন্ধতী ‘মেঘ ও রৌদ্র’-নামের একটি ছবি পরিচালনা করেন, তাতে লোকগান গাইলেন অমর পাল। এর আগে পীযুষ বসুর ‘শিউলি বাড়ি’ (১৯৬২) এবং এর পরে সুনীল বসু মল্লিকের ‘নিষ্কৃতি’ (১৯৭৮), দিলীপ রায়ের ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ (১৯৮২) ছবিতেও তিনি গান গেয়েছেন। এর মধ্যিখানে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর কাজ।

সত্যজিতের ডাক নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন সংগীতশিল্পী অনুপ ঘোষাল। সত্যজিৎ তখন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবির দ্বিতীয় পর্ব, ‘হীরক রাজার দেশে’ করবেন বলে ঠিক করেছেন। এ ছবিতে একটি চারণ চরিত্র আছে, সে গাইবে বাউল অঙ্গে গান। চারণ চরিত্রের জন্য সত্যজিতের চাই চারের দশকের গায়ক-নায়ক রবীন মজুমদারকে আর তাঁর গানে কন্ঠ দেওয়ার জন্য চাই লোকসঙ্গীতের জাদুকর অমর পালকে। রবীন মজুমদারকে খুঁজে আনার দায়িত্ব দিলেন তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আর অমর পালকে ডেকে আনার দায়িত্ব দিলেন গুপীবাঘা সিরিজের গুপির কণ্ঠ অনুপ ঘোষালকে।

অমরবাবু একদিন এলেন সত্যজিতের বাড়িতে। সত্যজিৎ তাঁর কণ্ঠে গান শুনতে চাইলেন। অমরবাবু গাইলেন–‘এ ভব সাগর রে’। গান শুনে খুব খুশি তিনি। এই আবেদনই তো তাঁর চাই আর চাই এই রকম সাবলীল কণ্ঠে লোকগানের সহজ সুর। সহজ সুরে সহজ কথায় গান লিখলেন সত্যজিৎ–‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’। গান তৈরি হতেই আবার ডাক পড়ল, পিয়ানোয় সত্যজিৎ বসলেন। দু’বার গেয়ে শোনালেন, তারপর হাতে দিলেন স্বরলিপি। গান তুললেন অমরবাবু, যে গান হয়ে উঠল ক্লাসিক। বিভিন্ন ইন্টারভিউতে অমরবাবু জানিয়েছেন, দেশে-বিদেশে অনেক সম্মান, অনেক পুরস্কার পেলেও এ গানের জন্যই তিনি পেয়েছিলেন জীবনের সেরা পুরস্কার। ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবি রিলিজের বেশ কিছুদিন পর তিনি একবার জলসা করতে গিয়েছিলেন বোম্বে। অনুষ্ঠানের শেষে একজন উদ্যোক্তা তাঁকে নিয়ে গেলেন একটি বাড়িতে। যাঁর কাছে নিয়ে গেলেন তিনি তখন খাচ্ছিলেন, হাতে খাবার মাখা; অমরবাবু চিনলেন, মানুষটি রাজ কাপুর। উদ্যোক্তা আলাপ করিয়ে অমরবাবুর পরিচয় দিয়ে বললেন যে, ইনিই সেই বিখ্যাত গায়ক যিনি সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে গান গেয়েছেন। অমনি উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন রাজ কাপুর, সেই এঁটো হাতেই অমরবাবুর বাহু চেপে ধরলেন, আপনার তো দারুণ সৌভাগ্য, তাঁর ছবিতে এতো ভালো গান গেয়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন! আমার তো সে আশা কিছুতেই পূরণ হল না এখনো!’ বলেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। অমরবাবু বুঝেছিলেন, সত্যজিতের মতো মহান একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করাটাই একটা মস্তবড় পুরস্কার; যে পুরস্কারের স্বীকৃতি দিলেন আর এক জগৎবিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক রাজ কাপুর। ততক্ষণে রাজ কাপুরের হাতের এঁটো সব লেগে গেছে অমরবাবুর পাঞ্জাবিতে। সেই পাঞ্জাবিটা তিনি রেখে দিয়েছিলেন সারাজীবন তেমনিভাবেই, এ ছিল যেন তাঁর সেই স্বীকৃতিরই স্বাক্ষর।

Spread the love

Check Also

নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একটি ভারতীয় ভাষা সকলের শেখা উচিত : রাজনাথ

নিজস্ব প্রতিনিধি। মহাদেব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। দেশের প্রতিটি কোনায় তাঁর মন্দির এক এবং অখণ্ড ভারতের …

শোভনের পাল্টা ববিদাকে চাই হোডিং কলকাতায়

নিজস্ব প্রতিনিধি। শোভনের পাল্টা ববি ! শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে একটি হোডিং চোখে পড়ে। যেখানে …

পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? জল্পনা কংগ্রেসে

নিজস্ব প্রতিনিধি। পশ্চিমবঙ্গ থেকেই কী রাজ্যসভায় যাবেন প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? তেমনি জল্পনা উস্কে দিয়ে গেলেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *